Breaking News

শোথ রোগের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

শোথের রোগ বিবরণ
শরীরে পানি জমা (শোথ) আলাদা কোন রোগ নয়,এটি অন্য রোগের লক্ষণ মাত্র।শোথ হইবার নানা বিধ কারণ থাকিতে পারে।হোমিওপ্যাথির আবিষ্কারক হ্যানিম্যান বলেছেন দেহের ভিতরে প্রদাহ, অধিক রক্তক্ষরণ,মূত্র গ্রন্থির পীড়া,মুত্র কোষের দোষে,হৃৎপিন্ডের পীরা,যকৃতের দোষ,অধিক মদ্যপান,সর্বাঙ্গীণ দুর্বলতা,অজীর্ণ,আমাশয়,রক্ত স্বল্পতা বা কোন কঠিন রোগ ভোগের পর শরীরে পানি জমে।যদি নিজেকে মাঝে মাঝে স্ফীত মনে হয় বা হাত, পা ও মুখমণ্ডল ফোলা ফোলা লাগে তবে ধারনা করা যেতে পারে শরীরে কোনো কারণে পানি জমছে।

শোথের লক্ষণসমুহ
১) আক্রান্ত স্থান স্ফীত হয় এবং সর্বাঙ্গ ধীরে ধীরে ফুলে উঠে।
২) আক্রান্ত স্থানে আঙ্গুল দিয়ে টিপলে গর্ত হয় এবং আঙ্গুল তুলে নিলে অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঐ গর্ত থাকে পরে মিলে যায়।
৩) চর্ম ফ্যাকাসে, উজ্জল ও শীতল হয়।
৪) অতিশয় দুর্বলতা, ক্ষুধাহীনতা ও পিপাসা বৃদ্ধি পায়।
৫) উদরাময়,মুত্র স্বল্পতা ও লালবর্ণের মুত্র।
৬) শোথ কোন নির্দিষ্ট রোগ নয়,অন্যরোগের উপসর্গ।
৭) রক্তে জলীয় অংশ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য দেহ কোষগুলো প্রথমে আক্রান্ত হয়।দিনের বেলায় পদদ্বয়ে শোথ বৃদ্ধি এবং রাতে পায়ের শোথ ভাব কম থাকে।
৮) শ্বাসকষ্ট,উদরাময়,হাঁপানি বোধ।ঘর্মরোধ,পিপাসা এবং নড়াচড়া করতে কষ্ট।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

ডিজিটেলিসঃ এই ঔষধ ব্যবহারের পূর্বে প্রথমে হৃৎপিণ্ডের নাড়ীর গতি ভাল করিয়া জানা আবশ্যক, কারন ইহাতে নাড়ী ও হৃৎপিণ্ড অত্যন্ত দুর্বল থাকে,নাড়ীর প্রতিঘাত (beat) মিনিটে ৩০/৪০ বার পর্যন্ত এবং ৩য়, ৫ম, অথবা ৭ম আঘাত বিলুপ্ত হয়, হৃৎপিণ্ডের ও নাড়ীর এই প্রকার অবস্থা না থাকিলে ডিজিটেলিস প্রয়োগে বিশেষ ফল হইবে না।সাধারণ শোথ ও উদরীতে কেবলমাত্র রোগীর প্রস্রাবের উপর লক্ষ্য রাখিয়া অনেক স্থলে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।


লিয়াট্রিসঃ- সর্বাঙ্গীণ শোথ অর্থাৎ সমস্ত শরীর ফুলা প্রস্রাব পরিমানে কম।এর ফলে প্রস্রাবের পরিমান বৃদ্ধিির মাধ্যমে শোথ রোগ আরোগ্য হয়।

অক্সিডেনড্রনঃ– সমস্ত অঙ্গ প্রতঙ্গের শোথ ও ফোলা, পেটে পানি জমা,শ্বাস কষ্ট,প্রস্রাব অল্প ইত্যাদি লক্ষনে ব্যাবহার করলে যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায়।

এপোসাইনামঃ- হৃৎপিন্ডের রোগসহ সকল প্রকার শোথেই ইহা উপকারী।ইহাতে মতিস্কের অত্যন্ত গোলযোগ থাকে,মাথা খুব ভারী হয়,নাড়ী অত্যন্ত ক্ষীণ,কোষ্ঠবদ্ধ, প্রস্রাব অতি অল্প, প্রস্রাব ঘোলা ও গরম,প্রস্রাবে ঘন শ্লেষ্মা,অনেক সময় প্রস্রাব অসাড়ে নির্গত হয়,বুকে পিঠে চাপবোধ, কিছু খাইলে নিশ্বাস ফেলিতে কষ্ট হয়,নিশ্বাস জোরে টানিয়া ফেলে,বুকে বেদনা ও হৃৎপিণ্ডের মধ্যে এক প্রকার অব্যক্ত যন্ত্রণা হয়,নাড়ী সবিরাম কিম্বা অত্যন্ত দুর্বল অথবা একেবারে পাওয়া যায় না।শোথ রোগের জন্য এটি একটি উৎকৃষ্ট ঔষধ।অত্যন্ত পানি পিপাসা ও পানের পরই বমি বমি ভাব।প্রস্রাবের পরিমান কম,শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট।হৃদরোগ বা কিডনির পীড়াজনিত শোথে ইহা অধিক উপকারী।পেট বেদনা করে,রোগী যেদিকে চাপিয়া শোয় সেই দিক অধিক ফোলে।


লাইকোপোডিয়াম – লিভার পীড়াগ্রস্ত ব্যাক্তিগণের শোথরোগে লাইকোপোডিয়াম উপকারী। কোনও শোথ রোগে পায়ে অধিক ফোলা থাকিলেও সেই ফোলার উপর ঘা থাকিলে ইহা আরও অধিক উপযোগী।লাইকোপোডিয়ামে রোগীর উপরার্ধ যেমন –হাত,মুখ,বুক,গলা ইত্যাদি শুষ্ক শীর্ণ এবং নিম্নাঙ্গ যেমন পেট,পাছা, পা ইত্যাদি খুব ভারিবোধ ও অত্যন্ত ফোলা-ফোলা দেখায়। হৃৎপিণ্ডের পীড়াজনিত শোথে ইহা আর্সেনিক প্রভৃতি অন্যান্য ঔষধ অপেক্ষাও অনেক সময়ে অধিক উপকার করে পেরিকার্ডিয়ামের ও প্লুরার শোথেও লাইকোপোডিয়াম উপকারী।

এপিস মেলঃ- ইহাতে রোগীর পিপাসা থাকে না, প্রস্রাব অল্প পরিমাণে হয়,গায়ের চামড়া সাদাটে বা স্বচ্ছ দেখায়, চোখ, পা অধিক ফোলে রোগী আদৌ শুইতে পারে না ।অত্যন্ত শ্বাসকষ্ট,একবার শ্বাস লইয়া মনে করে পরবারে আর শ্বাস লইতে পারিবে না এই তাহার শেষ নিঃশ্বাস।চোখের নীচের পাতা অধিক ফোলে।

ঈগল ফোলিয়াঃ-সর্বপ্রকার যান্ত্রিক রোগ সংযুক্ত শোথ,উদরী,স্বল্প প্রস্রাব,চোখ,মুখ,হাত পা,পেটফোলা, জ্বর,অরুচি এবং বহুদিন যাবৎ প্লীহা,পেটের অসুখ,আমাশয় ইত্যাদিতে ভুগিয়া বা মাঝে মাঝে ঐরূপ হইয়া ক্রমশঃ ফুলিয়া পড়িলে ইহাতে উপকার হইবে।বেরি-বেরি  রোগের ফোলাতেও ইহাতে উপকার হয়।

ডিজিটেলিসঃ- হৃৎপিন্ডের পীরা জনিত শোথ,শ্বাস-প্রশ্বাসে অত্যন্ত কষ্ট,নাড়ির গতি অসম।চলিতে চলিতে হঠাৎ নাড়ি থামিয়া যায়।আবার চলিতে থাকে।তৃতীয় পঞ্চম কিংবা সপ্তম স্পনদন বিল্যুপ্ত হলে এটাই প্রধান ঔষধ।


আর্সেনিক এলবমঃ হাত,পা,পেট,সমস্ত দেহের শোথ বিশেষ করে মুখের চামড়া ফ্যাকাসে,নীল বা সবুজ আভা।খুব দুর্বলতা সামান্য নড়াচড়া করলে অবসন্নতা।রাতে মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে, অস্থিরতা।খুব পিপাসা কিন্তু অল্প অল্প জলপান, হৃদপিণ্ডের শোথ।

এমন বেঞ্জোয়িকামঃ যে সকল ব্যাক্তির প্রস্রাবে এলবুমেন থাকে, প্রস্রাব অত্যন্ত অল্প পরিমাণে হয়,প্রস্রাব ধরিয়া রাখিলে ভিতরে ধোঁয়ার মত পদার্থ দেখিতে পাওয়া যায়,অত্যন্ত কটু গন্ধ থাকে, প্রস্রাব কখনও কখনও লালবর্ণ হয় এবং লালবর্ণের ঘন তলানি পড়ে, তাহাদের পীড়ায় ও শোথে ইহা অধিক উপকারী।

সাইরিকাঃইহা হৃৎপিণ্ডের ও কিডনি সম্বন্ধীয় কতিপয় পীড়ায়,শোথরোগে ও বাতে ব্যবহৃত হয়।ইহা সেবনে ঘর্ম ও প্রস্রাবের পরিমাণ বৃদ্ধি হয়, সেইজন্য ইহা সকল প্রকার শোথে, বিশেষতঃ হৃৎপিণ্ডের ও কিডনির পীড়া জনিত শোথরোগে অধিক উপকারী।

এম্পিলপসিস ঃপ্রস্রাবের দোষজনিত শোথ,হাইড্রোসিল এবং স্ক্রুফুলাস-ব্যক্তির পুরাতন গলাধরায় ইহা অধিক উপকারী।তদ্ভিন্ন  চক্ষুর পিউপিল বিস্তৃত,বামদিকের পাঁজরায় কষ্টাল প্রদেশে স্পর্শ কাতরতা তীক্ষ্ণ বেদনা, কনুইয়ের হাড়ে ও পিঠে এবং সমস্ত অঙ্গে বেদনা, বমি ও বাহ্যের সহিত কোঁথানি, পেটে গড়গড় শব্দ এই ঔষধের বিশিষ্ট লক্ষণ।

কোয়ার্কাস গ্ল্যাণ্ডিয়ম ঃপুরাতন প্লীহা ও প্লীহাজনিত শোথরোগে ইহা পূর্বে ব্যবহৃত হইত। মাথাঘোরা মাথায় শব্দ, কানে কম শোনা,কালা হওয়া, লিভার পীড়া ও শোথ,ম্যালেরিয়া জ্বরসহ পেটফাঁপা ইত্যাদিতে ইহা ব্যবহার্য।

থেরিডিয়নঃ স্নায়ুরবোধ শক্তির আধিক্য।ক্ষয়রোগ ধাতুগ্রস্ত ব্যক্তির উপরে ইহার বিশেষ কাজ।শির ঘূর্ণন,বমিসহ মাথা ঘোরা, হৃদপ্রদেশে অদ্ভুদ ধরণের বেদনা,রক্তস্রাবী যক্ষ্মারোগ,গণ্ডমালা প্রভৃতি বহু রোগে ইহা দ্বারা উপকার পাওয়া যায়।যে সকল ক্ষেত্রে নির্বাচিত ঔষধ দীর্ঘদিন কাজ করে না সেখানে ইহা বিশেষ উপকারী।পায়ের ফুলা,নিম্নাঙ্গে কামড়ানি বেদনা।

আর্জেন্ট ফস ঃশোথ রোগে ইহাতে প্রস্রাব নিঃসরণে সহায়তা করে।

এসেটিক এসিড ঃসর্বাঙ্গীণ শোথ কিম্বা উদরীর সহিত উদরাময় ও বমন কেবলমাত্র এসেটিক এসিডেই আছে, অন্য ঔষধে নাই।

হেলিবোরাস ঃহৃৎপিন্ডের গোলযোগের কারণে শোথ ও উদরীরোগে প্রস্রাব কালবর্ণ কিম্বা ঘোলা,পরিমাণে অত্যন্ত অল্প,প্রস্রাব ধরিয়া দেখিলে তাহাতে ধোঁয়ার মত পদার্থ ভাসে,তলানি কফি গুঁড়ার মত, বাহ্য আমমিশ্রিত, এই সমস্ত লক্ষণে হেলিবোরাস উপকারী।বক্ষশোথ  নিশ্বাসে ও বসিতে কষ্ট দমবন্ধভাব হয়।

ল্যাথাইরাস ঃপা ঝুলাইয়া চেয়ারে বা বেঞ্চিতে বসিয়া কাজ করিলেই পা ফুলিয়া উঠে।
স্যাম্বুকাস ঃকিডনির তরুণ প্রদাহ জনিত শোথরোগে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগসহ প্রচুর পরিমাণে প্রস্রাব হয় ও ঘন সেডিমেণ্ট থাকে।
শোথ রোগের রোগীর জন্য পরামর্শঃ
১) গর্ভাবস্থায় ও মাসিক চলাকালে হাতে-পায়ে ও মুখমণ্ডলে পানি আসতে পারে।এছাড়া অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, মেনোপজ কিংবা থাইরয়েড, লিভার বা কিডনি সমস্যারলক্ষণও হতে পারে শরীরে পানি জমা। এরজন্য চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
২) তবে প্রাথমিকভাবে রেহাই পেতে রয়েছে ঘরোয়া কিছু পন্থা।স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে এসব উপায় উল্লেখ করা হয়।প্রচুর পানি পান করুন: যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান করলে পানি জমা কমানো যায়।তবে সতর্ক থাকতে হবে যেন সমস্ত দিনের মধ্যে সুষমভাবে পানি পান করা হয়। কারণ একেবারে অধিক পানি পান করলে উল্টো প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
৩) লবণ ও চিনি খাওয়া কমান: লবণ কোষে পানি ধরে রাখে এবং লবণের আধিক্য শরীরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে।অপর দিকে, চিনি দেহে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, ফলে দেহ থেকে সোডিয়াম তথা লবণ নিষ্কাশন কমিয়ে দেয়।বেছে নিন প্রাকৃতিক মূত্রবর্ধক:ফার্মেসিতে ছুটে যাওয়ার আগে রান্নাঘরের দিকে একবার নজর দিন।ঘরেই তৈরি করে নিতে পারেন প্রাকৃতিক মূত্রবর্ধক।বাঁধাকপির কাঁচাপাতা,সবুজ চা,অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার,ধনিয়াপাতা, জিরা ইত্যাদি হতে পারে ঘরোয়া সমাধান।
৪) রসুন: সকালে খালি পেটে রসুন খেলে উপকার হতে পারে।এটি চর্বি ভাঙতেও সহায়তা করে।
৫) বরফ: একটি পাতলা কাপড়ে বেশ কয়েকটি বরফের টুকরা নিয়ে পানি জমা জায়গায় চেপে ধরুন।এটি কিছুটা প্রশান্তিদায়ক হতে পারে।
৬) অ্যালকোহল বর্জন করুন: অ্যালকোহল পান হতে পারে শরীরে পানি জমার কারণ,এটি শরীরে জোর করে অধিক পানি জমিয়ে রাখে।

About The Author

DR. MOHAMMAD SHARIFUL ISLAM

নামঃ- ডা. মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম হোমিও হল সংক্ষিপ্ত নামঃ এস এই হোমিও হল

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *