Breaking News
মায়াজম পরিচিতি

মায়াজম পরিচিতি

সোরা মায়াজম

সিফিলিস মায়াজম

সাইকোসিস মায়াজম

টিউবারকুলার মায়াজম

 

মায়াজম কি

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিধান মতে, মায়াজম হল রোগের মূল কারণ এবং জীবাণু গুলো হল উত্তেজক কারণ।যে সকল প্রাকৃতিক অদৃশ্য কারণসমূহ হইতে রোগ উৎপত্তি হয়, সে সকল কারণ সমূহকে মায়াজম বলে।

মহাত্মা হ্যানিম্যান বলেন, “যাবতীয় রোগ মায়াজমের অশুভ প্রভাবে সৃষ্টি হয়।” মায়াজম শব্দের অর্থ উপবিষ, কলুষ, পুতিবাষ্প, ম্যালেরিয়ার বিষ প্রভৃতি। যাবতীয় রোগের কারণই হল এই মায়াজম। তরুণ পীড়া তরুণ মায়াজমের অশুভ প্রভাবে এবং চিররোগ চির মায়াজমের অশুভ প্রভাবে সৃষ্টি হয়। ইহা প্রাকৃতিক রোগ সৃষ্টিকারী দানব।

মহাত্মা হ্যানিম্যান এর মতে, অর্গানন অব মেডিসিন এর ৭৮নং সূত্রে বলেছেন, “প্রকৃত স্বাভাবিক চিররোগ, চিররোগ বীজ হতে উৎপন্ন হয়। যদি উপযুক্ত ঔষধ দ্বারা রোগ আরোগ্য না করিয়া উহাদের অবহেলা করা হয়, তাহা হইলে তাহারা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাইয়া রোগীর মানসিক ও দৈহিক সর্বপ্রকার যত্ন নেওয়া সত্ত্বেও তাহাকে আজীবন অধিক হতে অধিকতর যন্ত্রণা দিয়ে থাকে।”

অর্থাৎ চিররোগবীজ হইতেই প্রকৃত চিররোগ সমূহ উৎপন্ন হয়। কেবল স্বাস্থ্যকর স্থানে বাস, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, শারীরিক ও মানসিক উন্নতির সর্বোত্তম ব্যবস্থা এবং জীবনীশক্তির যথাসাধ্য চেষ্ঠা ও তাহাদের দুর করতে পারে না। চিররোগ সমূহের মূল কারণ হল তিনটি। যথা- সোরা বা আদি রোগবীজ, প্রমেহ রোগবীজ, ও উপদংশ রোগবীজ। এই তিন ধরণের রোগ বীজ হতে অসংখ্য প্রকারের চিররোগ মানবজাতীকে আজীবন বহুজাতীয় শারীরিক ও মানসিক ব্যাধিতে উৎপীরণ করিতেছে।

হ্যানিম্যান বলেছেন, চিররোগ সৃষ্টির মূল কারণ হইল তিনটি চিররোগবীজ। ইহাদের মধ্যে সোরা হইল আদি রোগ বীজ। সকল রোগের মূল কারণ হইল সোরা। এমনকি প্রমেহ এবং উপদংশ নামক আদি রোগবীজের উৎপত্তি ও সোরা হতে; এজন্য সোরাকে আদি রোগবীজ বলা হয়।

হ্যানিম্যান বলেছেন, বংশ পরস্পরের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানব দেহের মধ্যে এই সোরা মায়াজম কল্পনাতীতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন অসংখ্য প্রকারের বিকৃতি, ক্ষত, বিশৃঙ্খলা ও যন্ত্রণার প্রতিমূর্তি রুপে অন্ত পীড়ায় সৃষ্টি করে থাকে।

সুতরাং মায়াজম হচ্ছে এক ধরনের গতিময় দূষণ মাধ্যম যাহা জীব দেহের মধ্যে বিভিন্ন অঙ্গে একবার প্রবিষ্ট হলে জীবনীশক্তির উপর প্রভুত্ব করে, ব্যক্তিকে সার্বিকভাবে এমনিধারায় দূষিত করে যার পিছনে একটি স্থায়ী রোগজ অবস্থা স্থাপন করে যাহা সম্পূর্ণ রুপে মায়াজম বিরোধী প্রতিকারক দ্বারা দূরীভূত না হলে রোগীর সারাজীবন ব্যাপী বিরাজ করবে এবং বংশপরস্পরায় প্রবাহমান থাকে।

 

(Miasm is transcendental dynamically polluting media which once gained establishment into the system of living being, overpowers the vital dynamis, pollutes the individual as a whole in such a way that it leaves behind a permanent stigma or dyscrasia which if not completely eradicate with the suitable anti-miasmatic remedy, will persist throughout the life of the patient through Generation to generation).

মায়াজমই হচ্ছে রোগজ শক্তির (Disease dynamis) গতিময় প্রভাব দ্বারা (Dynamics influence) সমস্ত রোগ বা অসুস্থতার সৃষ্টি হয়। এর সাথে কোন রোগ ও সিন্ড্রোম এর প্রিসিপিটেটিং ও প্রিডিসপোজিং (Precipitating & Predisposing) ফ্যাক্টর এজেন্ট হিসাবে কাজ করে।

হ্যানিম্যান অর্গাননের ৮২নং সূত্রে বলেছেন,“চিকিৎসাশাস্ত্রে যদিও চিররোগ সমূহের প্রধান উৎসস্থল এবং তার চিকিৎসা প্রণালী ও বিশেষ বিশেষ ঔষধ সমূহ আবিষ্কারের সাথে সাথে অধিকাংশ রোগের চিকিৎসা প্রণালী ও চিকিৎসা বিষয়ক জ্ঞান সীমার মধ্যে এসেছে, তথাপি প্রত্যেকটি চিররোগের চিকিৎসার জন্য ঔষধ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে লক্ষণ ও বিশেষত্বগুলি সাবধানে সংগ্রহ করার কাজ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণের পক্ষে এখনও অপরিহার্য। কারণ, এই প্রকারের প্রত্যেকটি রোগের ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসা ছাড়া প্রকৃত আরোগ্য সম্ভব নয়।

মায়াজম সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
(১) সোরা
(২) সিফিলিস
(৩) সাইকোসিস
এছাড়াও আরেকটি মিশ্র মায়াজম রয়েছে।
(১) টিউবারকুলার

সোরা মায়াজম

সোরা হচ্ছে অতিন্দ্রীয়, গতিময় দূষিত রোগজ মাধ্যম যাহা জীবদেহে অভ্যন্তরীন ও বাহ্যিক সংবেদনশীলতা সৃষ্টি করে, এবং জীবনীশক্তিকেদুর্বল করে রোগের আধার হিসাবে গড়ে তুলে। ইহা কোন বস্তু নয়, এটি একটি সত্তা বা অবস্থা বা ধাতুগত পূর্বাবস্থা। ইহা হচ্ছে সমস্ত রোগের ভিত্তি।
সোরার প্রথম ও অদৃশ্য মূর্তি এবং দৈহিক কুন্ডায়ন। সোরার বাহ্য ও দৃশ্যমান মূর্তি। তবে এই কথা মনে রাখিতে হবে যে, সর্বপ্রথম নিয়ম লঙ্ঘন, পরে অসৎ, অন্যায় মনন, তাহার পরে অসৎ ও অন্যায় কল্পনা ও চেষ্টা বা কুন্ডায়ন এবং সর্বশেষে এই মানসিক অবস্থা হইতে বাহ্যদেহে প্রতিবিম্বিত বা প্রতিফলিত অবস্থা। এই ক্রমগুলি আমাদের সর্বদা স্বরণ রাখা কর্তব্য।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে, সোরার রোগী কে? সোরার লক্ষণ প্রকৃতি অনেক। রোগীর মানসিক সার্বদৈহিক, আঙ্গিক সর্বস্তরে সোরার লক্ষণ বিদ্যমান।

সোরা মায়জমের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ

সাধারণ প্রকৃতিঃ সোরা কেবল মাত্র ক্রিয়াগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এর ফলে শরীরে প্রকাশ পায় অত্যাধিক অনুভূতিপ্রবণতা, চুলকানি, উত্তেজনা, যে কোন রকমের রক্তাধিক্যতা প্রদাহ এবং জ¦ালা। সোরা এককভাবে কখনও যান্ত্রিক পরিবর্তন আনে না। যদি সোরার সঙ্গে অন্য কোন মায়াজমের সংমিশ্রণ না হয়।

আক্রমণেরধারাঃ দেহের বহিরঙ্গেও কলাসমূহ, স্নায়ুতন্ত্র, এন্ডোক্লিনতন্ত্র, ধমনী ও শিরা, যকৃত ও চর্মের উপর। 

রোগের প্রকৃতি বা উৎসঃ ঘাটতিমূলক বিশৃঙ্খলা, পর্যায়ক্রমিক রোগ,সবিরাম প্রকৃতির ব্যাধি, একদৈশিক ব্যাধি, অচির রোগ ও তার প্রবণতা, মূত্রযন্ত্রের বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি।

মানসিক অবস্থাঃ স্বার্থপর, পরিপূর্ণ আবেগপ্রবণ, কল্পনা প্রবণ। নানান অনুভূতি আছে কিন্তু সামান্য মাত্র পরোক্ষগোচর লক্ষণ থাকে না।
ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়াঃ অত্যাধিক ক্রিয়াশীল।

খাদ্যে ইচ্ছা- অনিচ্ছাঃ মিষ্টি, টক, ভাজা জিনিস ইত্যাদি খাওয়ার ইচ্ছা; উত্তেজক জিনিস যেমন- চা, কপি, তামাক, প্রভৃতিতে আকাঙ্খা স্নায়ুমন্ডলীকে সতেজ করার জন্য। গরম খাদ্য ও মাংস খাওয়ার আকাঙ্খা কিন্তু সিদ্ধ খাদ্যে অনিচ্ছা।

হ্রাস-বৃদ্ধিঃ উদরাময়, ঘর্ম, প্রস্রাব, শয়ন, নিদ্রা, গরম, উত্তাপপ্রয়োগে, গ্রীষ্মকাল, ক্রন্দন, আহার ও চাপা দেওয়া চর্মরোগের বহিঃপ্রকাশে উপশম হয়। সূর্যদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এবং ঠান্ডায় বা শীতকালে বৃদ্ধি হয়।

মানসিক লক্ষণঃ অনুভূতিশীল, সর্তক, চটপটে, নানা কল্পনার পূর্ণ কিন্তু তা কাজে পরিণত করার প্রবণতা নেই। ভ্রান্ত বা দার্শনিকতা, সামান্য পরিশ্রমে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি আসে, শোক ও দুঃখ থেকে পীড়া হয়, উৎকন্ঠা ও উদ্ধেগ, আত্নবিশ্বাসহীন এবং মৃত্যু, অন্ধকার, একাকীত্ব ও ব্যর্থতার ভয়। বর্তমান অবস্থা, পরিবেশ, আর্থিক অবস্থা ও বিবাহিত জীবনে অতৃপ্ত। অস্থিরতা ও রয়েছে।

মস্তকঃ ক্রিয়াগত বিশৃঙ্খলাহেতু মাথাঘোরা, ইন্দ্রিয়সমূহে অত্যানুভূতিপ্রবণতা বা অস্বাভাবিকতা, অত্যাধিক প্রতিক্রিয়াশীলতা, মাথাধরা সাময়িক এবং পিত্তপ্রাধান্য ও বমিভাব, দিবাভাগে বৃদ্ধি, নিদ্রা ও উত্তাপপ্রয়োগে উপশম হয়। চুল শুষ্ক, তেলবিহীন এবং সহজে উঠে যায়। মাথার তালু শুষ্ক, আঁশযুক্ত ও খুসকিসহ চুলকানি।

চক্ষুঃ দিবালোকে ও আলো অসহ্য, চুলকানি ও জ¦ালা, চোখের সম্মুখে বিন্দু বা দাগ ভাসে।

কর্ণঃ ক্রিয়াগত এবং স্নায়ুবিক উপসর্গ, কানের ভিতর শুকনো ও খুসকিযুক্ত, শব্দে অতি অসহিঞ্চুতা।

নাসিকাঃ গন্ধে অতীব অনুভূতিপ্রবণ, খুব তীব্র গন্ধ অথবা সুগন্ধযুক্ত গৃহে নিদ্রা যেতে পারে না। রান্নার গন্ধ, রংয়ের গন্ধ, ফুলের গন্ধে বমিভাব আসে, খাদ্যে অরুচি।

আস্বাদঃ পোড়ার মতো (চরিত্রগত)। আস্বাদের পরিবর্তন হয়। যথাঃ টক মিষ্টি তেতো ইত্যাদি অস্বাভাবিক আস্বাদ।

পাকস্থলীঃ সদাই ক্ষুধার্ত এমন কি পেট ভর্তি থাকা সত্তেও অসময়ে ক্ষুধা, খাবার পরে পেটের বায়ু এবং অজীর্ণতা বৃদ্ধি পায়। পেট খালি বোধ হয়।

মলঃ অতিভোজন বা ভয় থেকে উদরাময়, সকালে যন্ত্রণাবিহীন উদরাময়, ঠান্ডা পানীয় পানে বৃদ্ধি ও গরম পানীয় পানে উপশম, কোষ্ঠকাঠিন্যসহ মাথার যন্ত্রণা, যকৃতের ব্যথাসহ নিদ্রালুতা ও আচ্ছন্নতা।

প্রস্রাবঃ হাঁচি, কাশি বা হাসিতে অসাড়ে প্রস্রাব।

হৃৎপিন্ডঃ হৃৎপিন্ডের ক্রিয়াগত গোলমাল বা অনুভূতি এবং দুর্বলতা অনুভব করে। খালিখালি বা বাধা আছে এরুপ ভাব। অপ্রীতিকর অনুভূতি এবং আবেগজনিত হৃকম্পন আনন্দ, শোক, ভয় ইত্যাদি থেকে, বুকে রক্তাধিক্য, জলজমা ও ফোলা বা শোথ।

চর্মঃ চর্মরোগ শুষ্ক, আঁশ অথবা ফোস্কাযুক্ত। এতে চুলকানি, জ¦ালা এবং সামান্য পুঁজ থাকে। চর্মে তাপোচ্ছাস, চর্ম শুষ্ক ও অপরিস্কার।

সোরা মায়াজমের প্রধান প্রধান নিদর্শন সমূহঃ

১) বিনা কারণে মানসিক চাঞ্চল্য, ভয়, উদ্বেগ ও উৎসাহ হীনতা।
২) ধর্ম বিষয়ে ভন্ডামীপূর্ণ মুখোশ পরা দার্শনিক।
৩) শ্রম বিমুখতা, সামান্য পরিশ্রমেই দৈহিক ও মানসিক অবসাদ।
৪) শীতকারতা, অল্পেই ঠান্ডা লাগে, ঠান্ডা অপছন্দ, অভ্যন্তর ও বাহিরে তাপ অপছন্দ।
৫) ঘুমানোর সময় মাথায় ঘাম, ঘুমের মধ্যে দাঁত কড়মড় করা।
৬) দিনরাত শুধু শুয়ে থাকতে চায় কিন্তু ঘুমালে অস্থিরতা দেখা যায়।
৭) অস্বাভাবিক ক্ষুধা। উদরাময় বা কোষ্ঠবদ্ধতা, কৃমির উপসর্গ।
৮) গোসলে অনিহা, অপরিস্কার ও নোংড়া থাকে।
৯) টক, মিষ্টি, ভাজা এবং চর্বি জাতীয় খাদ্য পছন্দ।
১০) নারী পুরুষের মধ্যে অস্বাভাবিক কামোত্তেজনা। স্ত্রীলোকদের অনিয়মিত ঋতু।
১১) সোরা রোগী স্পর্শকাতর। আলো, গন্ধ, ঘাম, শব্দ, গোলমাল প্রভৃতির প্রতি রোগী অতিমাত্রায় অনুভূতিপ্রবণ।
১২) সোরার হাত পায়ে জ¦ালা থাকে, মুখমন্ডলে তাপোচ্ছাস থাকে। গায়ের চর্ম রুক্ষ্ম ও অস্বাস্থ্যকর।
১৩) সোরার চুল শুষ্ক, চাকচিক্যবিহীন। অকালে চুল পাকে, অল্প পরিমিত স্থানে টাক পড়ে।
১৪) মুখ শুষ্ক, ব্রণ হয়ে থাকে।
১৫) পোড়ামাটি, চক, কয়লা, খড়িমাড়ি ইত্যাদি অখাদ্য খাইবার অভিলাষ।
১৬) চক্ষুর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং দৃষ্টিভ্রম হয়।
১৭) দাঁতে, মাড়িতে ও দাঁতের গোড়ায় ময়লা জমে।
১৮) নির্দিষ্ট সময় অন্তর রোগ লক্ষণের পুনরাবর্তন।
১৯) দুর্দমনীয় খোসপাঁচড়া ও চুলকানি। অসহ্য সুখকর চুলকানি। মাথায় মাস ও শুষ্ক উদ্ভেদ।
২০) চক্ষুর ব্যথা ভোরে শুরু হইয়া সূর‌্যাবর্তরুপে বৃদ্ধি পায় এবং সন্ধ্যায় উপশম হয়।
২১) টিউবারকুলার দোষের কারণে চক্ষুর পাতা আরক্তিম বর্ণের দেখায়।
২২) প্রদাহজনিত উপসর্গ, অত্যধিক চক্ষুঘর্ষণ করিতে ইচ্ছা হয়।
২৩) কর্ণে ফোড়া হয়। কানে সর্বদা চুলকানি থাকে, কানের ভিতর অপরিস্কার থাকে।
২৪) রোগীর নাসিকায় ক্ষত বা ঘা হওয়া সোরা ও সিফিলিস দোষের সংমিশ্রণজাত সংকেত বহন করে।
২৫) রান্নার, রং এর, উদ্ভিদের, ফুলের ও সুগন্ধি দ্রব্যের গন্ধে বমির উদ্রেক, বমি, শিরঃপীড়া, শিরোঃঘূর্ণন, খাদ্যদ্রব্যে অনিচ্ছা প্রভৃতি উপসর্গ দেখা যায়।
২৬) নাসিকার অভ্যন্তরে যন্ত্রণাদায়ক ব্রণের উৎপত্তি হয়।
২৭) ঠোঁট দুইটি নীলাভ, শুষ্ক ও জ¦রাবস্থায় উজ্জল লালবর্ণ হতে দেখা যায়।
২৮) মুখমন্ডলে ফুস্কুড়ি, ব্রণ দেখা দেয় এবং অপরিস্কার।
২৯) ক্ষুধার তাড়নায় মধ্যরাতে ঘুম হইতে জাগিয়া খাবার খাইতে চায়।
৩০) স্ত্রীলোকেরা গর্ভাবস্থায় নানা প্রকার অস্বাভাবিক দ্রব্য। যেমন- মাটি, খড়িমাটি, পোড়ামাটি, কাঠ, কয়লা, পেনসিল, চক, শ্লেটভাঙ্গা প্রভৃতি খাইতে ইচ্ছে করে।
৩১) যাবতীয় যন্ত্রণা আহারের পর বৃদ্ধি পায়।
৩২) সোরায় সূতার ন্যায় কৃমি ও গুহ্যদ্বারে সুড়সুড়ি অনুভূতি হয়।

মহামতি নীলমনি ঘটক তাহার রচিত “প্রাচীন পীড়ার কারণ ও তাহার চিকিৎসা” উক্ত বইয়ে উল্লেখ করেন যে, নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি মোটামুটি সোরাদোষ হইতে উৎপন্ন হয়ে থাকে। যথাঃ-

১) ছোট ছোট বালক বালিকাদের ক্রিমির দোষে, তাহাদের অন্ত্রে ক্রিমি জন্মে, এইজন্য তাহাদের অনেক প্রকার কষ্ট ও যাতনা হয়, গুহ্যদ্বারে অতিশয় চুলকায়- সুরসুর করে। সে জন্য তাহারা অত্যন্ত কাঁদে, মেজাজ বড়ই খারাপ হয়।

২) অস্বাভাবিক প্রকারের ক্ষুধা, অর্থাৎ হয়ত রাক্ষুসে ক্ষুধা অথবা একেবারে ক্ষুধাহীনতা।
৩) বিনা কারণে মানসিক চাঞ্চল্য, বিষণœতা, উৎসাহহীনতা, উদাসীনতা, অস্বাধারণ উদ্বেগ ও ভয়।
৪) মুখমন্ডলের বিবর্ণতা ও চক্ষুদ্বয়ের স্বাভাবিক উজ্জলতার একান্ত অভাব। মুখমন্ডলের লাবণ্যহীনতা।
৫) বালক- বালিকা, কিশোর- কিশোরীর ও যুবক যুবতীর নাসিকা হতে রক্তস্রাব। মাঝে মাঝে রক্তস্রাব হওয়ার প্রবনতা।
৬) ঘামের একান্ত অস্বাভাবিকতা, যথা কাহারও বা কপালে, কাহারও বা হাতে, পায়ে, কাহারও সমগ্র মুখমন্ডলে, কাহারও গুহ্য প্রদেশে অতিরিক্ত ঘামে অথবা ঐ স্থানেই ঘর্মোদগম, আংশিক ঘর্ম, একেবারে ঘর্মের অভাব, র্ঘমে দুর্গন্ধ ইত্যদি অস্বাভাবিকতা।
৭) অতি সামান্য কারণে এবং হঠাৎ অথবা বিনা কারণে সর্দি লাগা। অথবা অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগা সত্ত্বেও সর্দি না লাগা অথবা অন্য পীড়া আক্রমণ করে কিন্তু সর্দি হয় না।
৮) সামান্য কারণে নাসিকাটি প্রায়ই বন্ধ হইয়া যায়, এইজন্য মুখ দিয়ে নিশ্বাস প্রশ্বাস ফেলিতে হয়।
৯) নাসারন্ধ্রে প্রায়ই ছোট, বড়, লম্বা পিচুটি জন্মে এবং সর্বদাই আঙ্গুলের দ্বারা সেগুলি বাহির করিয়া ফেলিয়া দিবার প্রবৃত্তি।
১০) সামান্য পরিশ্রমে অত্যাধিক ক্লান্তি অথবা সামান্য কারণে অনেক দিনন ধরিয়া ব্যাধি যন্ত্রণা ভোগ করিতে হয় অথবা সামান্য কারণে শরীরের কোনও স্থানের মাংসপেশীতে, অস্থিতে, স্নায়ুতে অতিরিক্ত আঘাত বোধ এবং তাহা দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়।
১১) একদিকে শিরঃপীড়া, অতি সামান্য কারণে এবং মাঝে মাঝে হয়ে থাকে। মাথায় নানা প্রকারের কষ্ট, যাতনা ও নানা প্রকার অনুভূতি।
১২) মাঝে মাঝে মাথায় চুল উঠিয়া যায় ও অধিক বয়স হইতে না হইতে, কেশ সকল বিবর্ণ হয় ও পাকে। চুলের মধ্যে মরামাস, দাদ, চুলকানি ইত্যাদি হইবার প্রবণতা।
১৩) প্রায় বিনা কারণে বা অতি সামান্য কারণে এবং মাঝে মাঝে দন্তপাটিতে বা তাহার অংশে যন্ত্রণা, শোথ বা রক্তস্রাব।
১৪) মাঝে মাঝে সামান্য আঘাতে বা বিনা কারণে বিসর্প রোগ অর্থাৎ স্থানবিশেষে শোথ হইয়া অতিশয় যন্ত্রণার সঙ্গে শোথটি ক্রমে প্রসারিত হইতে থাকে এবং ক্রমে জ¦র ও পচনাধি উপসর্গ আনয়ন করিবার প্রবণতা। এইরুপে শরীরের স্থান বিশেষে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চয়ের প্রবৃত্তি।
১৫) সময়ে সময়ে মনে হয় যে, যেন শরীরের সমস্ত রক্তস্রােত উর্ধদিকে প্রবাহিত হইতেছে এবং তৎসঙ্গে যেন নিঃশ্বাস রুদ্ধ হইয়া উঠিতেছে। এইজন্য অত্যন্ত অস্থিরতা, মানসিক উদ্বেগ এবং পরিশেষে কপালে ও মুখমন্ডলে স্বল্পমাত্রা ঘাম হইয়া সে অবস্থায় উপনীত হয়। মাঝে মাঝে এই প্রকার অনুভব হইবার প্রবণতা।
১৬) স্ত্রীলোকদিগের মাসিক ঋতুর যাবতীয় বিপর্যয়, যথা অল্পতা, আধিক্য, রক্তের বিবর্ণতা, গন্ধ্যের তারতম্য, নানা প্রকার কষ্ট ও বেদনার অনুভূতি ইত্যাদি।
১৭) নিদ্রার একান্ত অভাব, নানা অস্বাভাবিকতা, খন্ড খন্ড নিদ্রা, নিদ্রার মধ্যে চমকিয়ে উঠা, নানা প্রকার দুঃস্বপ্ন, স্বপ্নে ভীত হওয়া, নিদ্রার মধ্যে অতিরিক্ত ঘাম, মল, মূত্র ইত্যাদির নিঃসরণ, চীৎকার করিয়া উঠা, দন্তে দন্তে ঘর্ষণ ও তজ্জন্য বিকট শব্দ, জিহ্বাতে চাকুম চাকুম করা, নিশ্বাস বন্ধ হইয়া যাইবার মত ভাব, অতিরিক্ত নাসিকাধ্বনি, সর্বদাই পার্শ¦পরিবর্তন, অত্যন্ত অস্থিরতা, লালাস্রাব, রক্তস্রাব, বিকট হাস্য করিয়া উঠা ইত্যাদি।  অতিরিক্ত নিদ্রালুতাও সোরাদোষজ।
১৮) জিহ্বাতে নানা বর্ণের লেপ, মুখে দুর্গন্ধ, দন্তে অতিরিক্ত ময়লা জমা, অতিশয় লালাস্রাব।
১৯) প্রাতঃকালে বমন, বমনের ইচ্ছা, বিনা কারণে মুখে জল উঠা বা জিহ্বার একান্ত শুস্কতা, মুখে নানা প্রকারের স্বাদবোধ, যথা- তিক্ত, লবণাক্ত, অম্লময় ইত্যাদি।
২০) দ্রব্যবিশেষ অতিরিক্ত প্রিয়তা অথবা একান্ত অপ্রিয়তা যথা দুগ্ধে অতিশয় প্রিয়তা অথবা দুগ্ধপানে একেবারে অনিচ্ছা।
২১) অতিশয় কোষ্ঠবদ্ধ বা মাঝে মাঝে কোষ্ঠবদ্ধ এবং মধ্যে মধ্যে তরল মলত্যাগ, বিনা কারণে অথবা স্বল্পকারণে অথবা উদরাময়।
২২) পেটের মধ্যে নানা প্রকার যাতনাবোধ, যথা- দ্রব্য বিশেষ আহারে ও সময় বিশেষে হ্রাসবৃদ্ধি হয়।
২৩) মলদ্বারের মধ্যে নানা প্রকারের অনুভূতি, যাতনা, বেদনা, মলের সহিত রক্ত বা রক্তের স্রাব এবং অর্শবলির আর্বিভাব।
২৪) ঋতু বিশেষে পায়ে ও অঙ্গুলির মধ্যদেশ হাজিয়া যাওয়া।
২৫) পায়ের অঙ্গুলিতে কড়া হওয়া এবং ঐ সকল কড়াতে মাঝে মাঝে যন্ত্রণা ও টাটানি ব্যথা।
২৬) আহারের সময়, চলাফেরার সময়, বসিয়া উঠিবার সময় বা পরিশ্রমের পর বসিবার সময়, শরীরের নানা স্থানে শব্দ (খটাস, খটাস) হওয়া, চলিবার সময় প্রতি পদক্ষেপে পায়ের হাড়ে ঐ প্রকার শব্দ।
২৭) শরীরের নানা স্থানে যন্ত্রণা ও বেদনা সকলের ঋতু বিশেষে শীততাপ বর্ষাদিঋতু ভেদে, শয়ন, উপবেশন এবং সঞ্চালন বিশেষ হ্রাসবৃদ্ধি।
২৮) শরীরের নানাস্থানে ফোঁড়া, চুলকানি ইত্যাদি হইবার স্বভাব। খোঁস-পাঁচড়া, চুলকানি, দাদ অথবা ঋতু বিশেষে হাত, পা ও গাল ইত্যাদি স্থান ফাটিয়া যাওয়া।
২৯) মেজাজ অতিশয় চটা, রুক্ষ ও কর্কশ, হৃদয়ে কাহারও প্রতি ভালবাসার একান্ত অভাব অথবা অন্যের অনিষ্ট করিবার প্রবল ইচ্ছা।
৩০) স্ত্রীপুরুষের মধ্যে অতিরিক্ত আসঙ্গ পিপাসা।
উপরের সোরাদোষের যে সকল লক্ষণ গুলো লিখিত হয়েছে, সেগুলি সুপ্ত সোরার লক্ষণ মাত্র। অর্থাৎ যখন এইগুলি মানবদেহে অবস্থান করে, তখন সোরা যেন লুকায়িত অবস্থায় থাকে এবং লোকে মনে করে যে তাহারা অতি সুস্থ, তবে যে তাহাদের দেহে ঐ প্রকারের কোনও লক্ষণ আছে, তাহা স্বাভাবিক বলিয়া মনে করে এবং এইরুপ অল্পবিস্তর সকল লোকেরই থাকে, এইরুপ ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে। কিন্তু তাহারা আদৌ মনে করে না যে, একদিন অতি সামান্য কারণেই সোরা উত্তেজিত হয়ে উঠবে এবং নানা প্রকার লক্ষণ সৃষ্টি করে তাহাদের জীবনী শক্তিকে দুর্বল করে দিবে।

সোরা মায়াজম হতে উৎপন্ন রোগ সমূহঃ

সাধারণতঃ নিম্নলিখিত রোগগুলি সোরা মায়াজম হতে উৎপন্ন হয়ে থাকে। যথাঃ- উদরাময়, পেটফাঁপা, অম্লাজীর্ণ, চুলকানিযুক্ত চর্মরোগ, চক্ষু ও নাসিকা হইতে কেবলই জলস্রাব ও তৎসমুদয়ে জ¦ালা, প্রদাহ ও জ¦ালাযুক্ত স্বরভঙ্গ, মেরুমজ্জা ও মস্তিকের অস্থায়ী প্রদাহ ও জ¦ালা, স্তন প্রদাহ, স্বরভঙ্গ, হৃদযন্ত্রেও প্রদাহ, বিসূচিকা, কোষ্ঠবদ্ধতা, নানা যন্ত্রের শুধু কার্যগত বিশৃঙ্খলা, শোথ প্রভৃতি সোরা মায়াজম হতে উৎপন্ন হয়ে থাকে।

সিফিলিস মায়াজম

মহাত্না হ্যানিম্যানের আবিষ্কৃত তিনটি মায়াজমের একটি হল সিফিলিস। সিফিলিস অর্থ উপদংশ বিষ। দূষিত সংগমের ফলে পুরুষদিগের লিঙ্গমুন্ডে এবং স্ত্রীলোকের বৃহৎ ও ক্ষুদ্র যোনি কপাটে ক্ষত লক্ষণ সিফিলিস দোষের সূচনা বা প্রাথমিক রুপ। অসদৃশ্যবিধানে চিকিৎসা করিয়া যদি ক্ষতটি চাপা দেওয়া হয়, তখন রোগাবস্থায় না থাকিয়া দোষের আকারে পরিগ্রহ লাভ করে যে বিষ সৃষ্টি করে, তাকে সিফিলিস মায়াজম বলে। ইহা সুস্থদেহে রোগ প্রবণতা সৃষ্টিকারী একটি মায়াজম হয়ে থাকে।

অর্জিত সিফিলিসঃ
যখন কোন দুষ্ট কামপ্রবৃত্তিজাত নিজের কুকর্মের ফলে তথা দূষিত মিলনের মাধ্যমে যৌনাঙ্গে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, ইহা স্থানীয় লক্ষণ। ইহাই অর্জিত সিফিলিস।

লব্ধ সিফিলিসঃ
যৌনমিলন ব্যতীত সিফিলিসের ক্ষত বা স্যাংকারের শুশুষায়, রোগাক্রান্ত মায়ের স্তন্য পানে, আক্রান্ত ব্যক্তিকে চুম্বনে, রোগীর ব্যবহুত থালা- বাসন, গ্লাস, বিছানা ইত্যাদি ব্যবহিৃত জিনিস ব্যবহারে রোগ সংক্রমিত হয় এবং দোষ সৃষ্টি করে তখন তাহাকে লব্ধ সিফিলিস বলে।

সিফিলিস মায়াজমের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সাধারণ প্রকৃতিঃ সিফিলিস সর্বত্রই ধ্বংসাত্নক, বিপথগামী, ন্যায়ভ্রষ্ট, স্বেচ্ছাাচারী উচ্ছৃঙ্খল, পুঁজ, ক্ষত ও ফাটা ঘা ইত্যাদি ক্রিয়াগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী।

আক্রমণধারাঃ মেসোডারমাল কলা, কোমল কলা, অস্থি, গ্রন্থিও কলা বিশেষত লসিকাসংক্রান্ত কলাকে আক্রমণ করে। এছাড়াও দেহস্থ খনিজ বস্তুও বিপাকে বিকৃতি ঘটিয়ে মস্তিকের অস্থি এবং রক্ত বৃদ্ধির ক্ষমতা খর্ব করে। অস্থি ও দন্তের গঠন বিকৃতি ঘটায়। রক্তের বিকৃতি রক্তশূণ্যতারোগ এবং খর্বাকৃতিরোগ সৃষ্টি করে।

রোগের উৎসঃ ধ্বংসমূলক বিশৃঙ্খলা, অঙ্গের বিকৃতি, অস্থির ভঙ্গুরপ্রবণতা, ক্ষত, পচনশীল ক্ষত সৃষ্টি করে। ধ্বংসমূলক এই মায়াজম হানিকর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। যেমনঃ রিকেঁস, তরুণাস্থির বিকৃতির ফল স্বরুপ খর্বাকৃতি, রক্তহীনতা, বারবার গর্ভস্রাব ঘটায়।

মানসিক অবস্থাঃ প্রত্যক্ষ অনুভূত অবস্থার উপলব্ধি সামান্য, অতি অসহিঞ্চতা, কোন কিছুর আকাঙ্খা, আগ্রহ, ইচ্ছা ও বোধশক্তি কম।

খাদ্যে ইচ্ছা- অনিচ্ছাঃ মাংসে অনিচ্ছা; ঠান্ডা খাবার পছন্দ করে।

হ্রাসবৃদ্ধিঃ পুঁজ নিঃসরণ ও পুরাতন ক্ষত উন্মুক্ত হলে উপশম। উদরাময় এবং প্রস্রাব হলে কোন উপশম হয় না। উপসর্গ কমে ঠান্ডা প্রয়োগে ও শীতকালে। উপসর্গ বাড়ে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত, রাত্রিকালে, গ্রীষ্মকালে, বিছানার গরমে এবং ঘামে।

মানসিক লক্ষণঃ বোকা, স্থুলবুদ্ধি, একগুঁয়ে, বিষণœ, বদ্ধমূল ধারণা, কোন উদ্দেশ্য বা যুক্তি খুঁজে পায় না কারও সঙ্গে মেলামেশার। নিজেকে ধ্বংস করতে চায়, আত্নহত্যার প্রবণতা। পাপী, সমাজের ক্ষতিকারক মস্তিকবিকৃতি। ঠান্ডা মাথায় মূল্যবান বস্তু ধ্বংস করে।

মস্তকঃ মস্তিকের স্নায়ুসংযোগে ধ্বংসহেতু মাথাঘোরা, পিছন দিকে মাথাধরা- রাত্রে আরম্ভ হয়ে কয়েকদিন থাকে। মাথাধরা যানারোহণ, পরিশ্রম, উত্তাপ, বিশ্রাম, শয়ন এবং নিদ্রায় বৃদ্ধি। উপশম হয় সঞ্চালন, ঠান্ডা প্রয়োগ, নাকে রক্তপাত হলে। গোছা গোছা চুল উঠতে থাকে, এক এক স্থানে টাক পড়ে; চোখ ও ভ্রুর চুল উঠে যায়। মাথার উপরের চামড়া পুরু এবং এতে সরস চটা পড়ে।

চক্ষুঃ অস্বাভাবিক গঠন বা বিকৃত চক্ষু, লেন্সের ক্ষত, অচ্ছোদপটলের ক্ষত, চোখের পাতার ক্ষত। কৃত্রিম আলো সহ্য করতে পারে না। গ্রন্থিবাতজনিত চোখে উপসর্গ। রাত্রে এবং উত্তাপে উপসর্গ বৃদ্ধি।

কর্ণঃ কর্ণের যান্ত্রিক উপসর্গ, ছিদ্রপথে ক্ষত, পুরু দুগন্ধযুক্ত পুঁজ, কানের পাশে ফাঁটা ও পিছনে একজিমা।

নাসিকাঃ ঘ্রাণশক্তি ও নাকের হাড় নষ্ট হয়ে যায়, নাক দিয়ে রক্ত পড়ে, নাকের মধ্যে সবুজ অথবা কালো চাপচাপ মামড়ি।

আস্বাদঃ ধাতুর আস্বাদ। লালাক্ষরণ, জিহ্বায় গভীর ফাটা ও দাঁতের ছাপ। শিশুরা প্রতিটি দাঁত ওঠার সময় অসুখে পড়ে।

মলঃ উদরাময়ে যেন দেহের সব কিছু নিংড়ে বেরিয়ে যায়, বিশেষ করে শিশু কলেরায়। রাত্রে বৃদ্ধি।

হৃৎপিন্ডঃ যান্ত্রিক বিনাশ, হঠাৎ হৃৎক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ইহা মানসিক ক্লেশের সঙ্গে সর্ম্পকিত নয়। প্রত্যক্ষ অনুভূত হৎলক্ষণ থাকে না, বিনা সর্তকতায় হঠাৎ মৃত্যু হয়।

চর্মঃ চর্মের উদ্ভেদ সহজেই পুঁজ ও ক্ষতে পরিণত হয়। এতে যন্ত্রণা থাকে। উদ্ভেদ চটাপড়া এবং তা থেকে পুঁজ বের হয়। চর্ম তৈলাক্ত, ঘর্মাক্ত ও অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত। চামড়ার উপরে তামার মতো দাগ।

নখঃ নখ কাগজের মতো পাতলা এবং দেখতে ঠিক চামচের মতো।

সিফিলিস মায়াজমের প্রধান প্রধান নিদর্শন সমূহঃ

১) রোগী মানসিক ভারসাম্যহীন, নির্বোধ, জড়বুদ্ধি সম্পন্ন এবং আত্নহত্যা প্রবণ।
২) রোগ লক্ষণ রাত্রে এবং তাপে বৃদ্ধি পায় ও ঠান্ডায় উপশম হয়।
৩) বিকলাঙ্গ, আবার অনেকে দেহযন্ত্র শুকাইয়া যায়।
৪) অস্থিক্ষয়, অস্থি আবরণে তীর বিদ্ধবৎ বেদনা, অস্থিবেদনা রাত্রিতে বৃদ্ধি।
৫) প্রচুর ঘাম হয় এবং সকল প্রকার স্রাবই দুর্গন্ধযুক্ত। ঘামে বৃদ্ধি।
৬) দুষ্ট জাতীয় ফোঁড়া, বাগী, গ্লান্ডসমূহের স্ফীতি, চুলকানিবিহীন চর্মরোগ এবং চুলকানি বিহীন তাম্রবর্ণের উদ্ভেদ নির্গমন।
৭) জিহ্বায় শে^তবর্ণের লেপাবৃত এবং উহাতে দন্তাকৃতির ছাপ পড়ে।
৮) সিফিলিসের রোগী মাংসে অনিচ্ছা। কিন্তু মাখন ও দুধ পানে অভিলাষ।
৯) অতি সহজেই পচন প্রবণতা সৃষ্টি হয়।
১০) হাতে পায়ের নখগুলি কাগজের ন্যায় হাল্কা ও ভঙ্গুর।
১১) মাথার উভয় পাশের চুল পড়ে যায়।
১২) মাথায় মরামাস জন্মে ও দুর্গন্ধ পূঁজ স্রাবকারী চর্মপীড়া পানি লাগিলেই বৃদ্ধি।
১৩) চক্ষুর পাতা, ভ্রু ইত্যাদি স্থানের চুলগুলি উঠিয়া যায় (বিশেষতঃ তরুণ রোগ ভোগের পর)।
১৪) মুখমন্ডল তৈলাক্ত। সমগ্র মুখে প্রচুর পরিমাণে ঘামে।
১৫) দাঁতের মাড়িতে ব্যথা ও পুঁজ সঞ্চয় হয় এবং দুর্গন্ধযুক্ত লালাস্রাব।
১৬) সূতার ন্যায় লম্বা চটচটে লালাস্রাব হয়।
১৭) স্ত্রীলোকদের ঋতুস্রাবের পূর্বে কণ্ঠস্বর ভঙ্গ হইতে দেখা যায়।
১৮) শ^াসরোদ্ধকর কাশি, কাশি অনেক সময় কুকুরের ডাকের ন্যায় আওয়াজ হয়।
১৯) অস্থিসমূহে পুষ্টির অভাব ও অস্থির জোড়াগুলিতে ব্যথা হয়।
২০) সিফিলিস মায়াজমের রোগী সাধারণতঃ অগ্নিকান্ড, হত্যাকান্ড ইত্যাদি স্বপ্ন দেখে।
২১) আত্নহননের অদম্য অভিলাষ, অহর্নিশি আত্নহত্যার সুযোগ সন্ধান করে।
২২) সূর্যাস্তের পর হইতে সকল যন্ত্রণার বৃদ্ধি ঘটে বলিয়া সূর্যোদয়ের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতিক্ষা করে।
২৩) স্মরণশক্তি অকল্পনীয় ও মারাত্নকভাবে হ্রাস পায়।
২৪) রোগলক্ষণ তাপে ও রাত্রে বৃদ্ধি পায় ও ঠান্ডায় উপশম হয়।
২৫) সিফিলিসের রোগী মাংসে অনিচ্ছা।
২৬) অগ্নিকান্ড, আত্নহত্যা ইত্যাদি বিভীষিকাময় স্বপ্ন দেখে।
২৭) জিহ্বার ধারগুলি দন্তের ছাপযুক্ত ও জিহ্বা সরস অথচ রোগীর প্রচুর পরিমাণে পানির পিপাসা হয়।
২৮) রোগীর গলক্ষত দেখা দেয়, গলার গ্ল্যান্ডগুলি স্ফীতিযুক্ত এবং টনসিল বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।
২৯) স্বাদহীন, সবুজ, হলুদ বা স্বচ্ছ শে^তবর্ণের চটচটে বা সুতার ন্যায় শ্লেষ্মা নির্গমন বিশেষরুপে পরিস্ফুট হয়।
৩০) পচনপ্রবণ চুলকানি বিহীন চর্মদ্ভেদ।
৩১) বিষণ্নতার কারণে একা থাকিতে চায় তাই সে লোকসঙ্গ পছন্দ করে না।

সিফিলিস মায়াজম হতে উৎপন্ন রোগ সমূহঃ

সাধারণতঃ নিম্নলিখিত রোগগুলি সিফিলিস মায়াজম হতে উৎপন্ন হয়ে থাকে। যথাঃ- দারুণ উৎকন্ঠাজনিত আত্নহত্যার ইচ্ছা, পচনশীল যে কোন রোগ, দুর্গন্ধ পুঁজ ও রস নিঃসরণকারী চর্মপীড়া, দুর্গন্ধযুক্ত ঋতু ও প্রদর স্রাব, কর্ণ, নাসিকা ইত্যাদিতে ক্ষত ও দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব। প্রস্রাব যন্ত্রের ক্ষত, গল ক্ষত, মেরুমজ্জার ক্ষত, লম্বা অস্থিসমূহের বাত, অস্থিক্ষয়, মুখে ক্ষত ও দুর্গন্ধ লালাস্রাব, হাতে পায়ে ও আঙ্গুলে হাজা ঘাঁ, ধমনীতে স্ফোটক, হৃদপিন্ডের দুর্বলতাহেতু রক্ত চলাচলে বিশৃঙ্খলা জনিত নানা প্রকার রোগ, গ্ল্যান্ড স্ফীতি ও পচন, উদরে ক্ষত, নাসিকায় ক্ষত, অন্ধত্ব, নৈরাশ্য ও উৎকন্ঠা হেতু উন্মাদ অবস্থা প্রভৃতি।

সাইকোসিস মায়াজম

সাইকোটিক মায়াজম হতে উদ্ভুত এবং সুস্থ দেহে রোগপ্রবণতা সৃষ্টিকারী একটি ধাতুগত দোষ বা মায়াজমেটিক অবস্থাকে সাইকোসিস বলে। গনোরিয়ার স্রাব কুচিকিৎসার ফলে চাপা পড়িলে যে ধাতুদোষ সৃষ্টি হয় এবং মানবশরীরে নানাপ্রকার অভ্যন্তরিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাহাকে সাইকোসিস মায়াজম বলে।

নারী পুরুষের অনৈতিক যৌনমিলনের ফলে গনোকক্কাস নামক এক প্রকার জীবাণুর তরুণ আক্রমণের ফলে দূষিত স্রাব হতে রোগ সৃষ্ট হয়ে থাকে। নারী ও পুরুষের জননেন্দ্রিয় পথে একটি জ¦ালাকর স্রাব এবং ক্ষত বা ক্ষয় সৃষ্টি করে থাকে।

কুচিকিৎসার ফলে বা এলোপ্যাথিক কুচিকিৎসার ফলে অবৈধ্য উপায়ে বাহ্য স্রাবটি লুপ্ত হলে বা চাপা পড়িলে রোগশক্তি অন্তমূর্খী হইয়া যে ধাতুদোষ সৃষ্টি হয় এবং অন্যান্য অঙ্গে আক্রান্ত হয়, ঐ অবস্থায় সাইকোসিসের বীজ পত্তন হয়ে থাকে এবং সাইকোসিস দোষের উৎপত্তি হয়।

সাইকোসিস মায়াজমের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সাধারণ প্রকৃতিঃ সাইকোটিকের সর্বক্ষেত্রেই অসম্ভব লক্ষণ দেখা দেয়। অঙ্গবৃদ্ধি যথা টনসিল, অবুর্দ, গ্রন্থি ইত্যাদিসহ আঁচিল, তান্ডব অর্বদ বা তন্তুবৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে রোগ সৃষ্টি করে থাকে।

আক্রমণধারাঃ কোমল কলা, অস্থি, বিভিন্ন গ্রন্থিতে (বিশেষত লসিকাগ্রন্থি সমূহ) আক্রমণ করে থাকে। জীবদেহের রাসায়নিক রুপান্তর বা বিপাক ক্রিয়া প্রকাশ করে থাকে। এন্ডোক্রিন গ্রন্থির ক্রিয়ায় বাধার ফলে স্থুলবৃদ্ধি, মিক্সোডোমা, অ্যাডিসন রোগের কারণ ঘটায়।

রোগের প্রকৃতি বা উৎসঃ কলাসমূহের জমা হওয়া বা অবক্ষেপন অথবা হানি। অতি বৃদ্ধি ঘটায় আঁচিল, অর্বুদ, তন্তুবৃদ্ধি রোগ ইত্যাদি দেহের বিভিন্ন অংশে কলার শুষ্কতা ঘটিয়ে খর্বাকৃতি, শুষ্কতা, রক্তশূণ্যতা, কোষসমূহে রস সঞ্চয়, নিচের পেট ও যৌনযন্ত্রের পুরাতন রোগ, অর্শ, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, বৃক্কপ্রদাহ, প্রস্টেট গ্রন্থিপ্রদাহ, অন্ডকোষ প্রদাহ, গেঁটেবাত, গ্রন্থিবাত, কটিবাত ইত্যাদি দেখা যায়।

মানসিক অবস্থাঃ নৈতিক চরিত্রের দিকে কোন প্রভাব বা আর্কষণ থাকে না। ধর্মেও না, কোন আধ্যাতিœক চিন্তার স্থান নেই, মনোবিকৃতি। অপরাধকর্মে প্রবল আকাঙ্খা। ধীরে ধীরে নানা ছলনা প্রকাশ পায়। সমস্ত রকমের আরোগ্যেও গতি অতি ধীর।

খাদ্যে ইচ্ছা- অনিচ্ছাঃ বিয়ার মদ চায়, যা কম বৃদ্ধি ঘটায় অন্য মদের অপেক্ষায়। মাংস পুরাতন সাইকোসিসকে জাগিয়ে তোলে। ঠান্ডা বা গরম খাদ্যে সবই পছন্দ করে।

হ্রাসবৃদ্ধিঃ শৈলষ্মিক পথ দিয়ে অস্বাভাবিক নিঃসরণে উপশম হয়। যেমনঃ শে^তপ্রদর, নাকের সর্দি ইত্যাদি। শারীয়বৃত্তির নিষ্কাশনে কোন উপশম হয় না। উপসর্গ কমে ধীর সঞ্চালনে, হাত-পা টান টান করলে, শুষ্ক আবহাওয়া, শুলে, চাপলে এবং চাপা পড়া স্রাব পুনরায় ফিরে এলে। আর বৃদ্ধি ঘটে ঠান্ডা বা ভিজা আবহাওয়ায় বিশ্রামে এবং মাংস খেলে।

মানসিক লক্ষণঃ মনের মধ্যে নানা অসম্বনয়, বিস্মৃতি, ভুলো মন, অমনোযোগী, কথা ধীরে বলে, দ্রুত উত্তর দিতে অক্ষম, কথা খুঁজে পায় না। ব্যবহারেও অসম্বনয় যথাঃ সত্য কথা বলে না, অত্যাধিক সন্দেহ পরায়ণ, হিংসুটে, রাগী, রুক্ষু ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির, গোপন করার স্বভাব।

মস্তকঃ চোখ বন্ধ করলে মাথা ঘোরে তাকালে ঠিক হয়ে যায়। মাথার শীর্ষদেশে যন্ত্রণা, বিষণœতাসহ কপালের দিকে যন্ত্রণা, দেহ ঠান্ডা। কাজকর্ম ও যানরোহণে বৃদ্ধি। সঞ্চালনে উপশম। অল্প বয়সে চুল পাকে- অত্যাধিক চুল পাকে। মাথায় চামড়ার মধ্যে ছোট ছোট গোল আকারে চুল উঠে যায়। মাথায় আঁশটে গন্ধ।

চক্ষু ও কর্ণঃ প্রচুর ঘন পুঁজ জন্মায় এবং পুঁজ বের হয়। জমাটবাধাঁ পিন্ড শিশুর কানের মধ্যে দেখা দেয়। সাইকোটিক পিতামাতার সন্তানের এরুপ হয়।
নাসিকাঃ ক্ষতবিহীন ঘ্রাণশক্তিহীনতা। নাকের মধ্যে আশঁটে গন্ধ। (চরিত্রগত লক্ষণ)

পাকস্থলী ও মলঃ কোন প্রকার খাদ্য সহ্য হয় না। পেটের শূলবেদনা চাপে উপশম। পেট চেপে শুলে উপশম (শিশুদের)। যন্ত্রণাসহ মল তোড়ে বেরিয়ে আসে, টকগন্ধযুক্ত, হাজাকারক, সবুজ বর্ণের, পেটে সর্বদা খামচানো যন্ত্রণা।

প্রস্রাবঃ শিশু মূত্রত্যাগকালে চিৎকার করে উঠে (লাইকো, সার্সা)।

হৃৎপিন্ডঃ বাত থেকে হৃদরোগ দেখা দেয়। প্রত্যক্ষ অনুভূত লক্ষণ বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। হৃৎকম্পন ও শ্বাসকষ্ট হয় মাঝে মাঝে এতে হঠাৎ মৃত্যু হতে পারে বিশেষত শোথ রোগের পূর্বে। চলাফেরায় যন্ত্রণা। যানরোহণে ও মৃদু বায়ামে উপশম।

চর্মঃ চর্মভেদ পুরু অথবা শক্ত ও পিন্ড আকারের অথচ তাতে কোন ব্যথা বা চুলকানি থাকে না। আঁচিল, অর্বুদ, দাড়ির একজিমা দেখা যায়। মুখের চর্ম তৈলাক্ত। সংক্রামক ফুসকুড়ি, কড়া, গাত্রচর্মের নানা বর্ণের বিকৃতি ও বির্স্তীণ অঞ্চল জুড়ে।

নখঃ অসমান, ভঙ্গুর, লম্বালম্বি উঁচু রেখাযুক্ত, মোটা, ভারী, বিকৃত, কুগঠিত।

 

সাইকোসিস মায়াজমের প্রধান প্রধান লক্ষণ সমূহঃ

১) রোগী গোপনপ্রিয়, সর্ববিষয়ে গোপন করার প্রবৃত্তি।
২) নির্মমতা বা কঠোরতা, ক্রোধান্তিত্ব, অপরাধপ্রবণতা ও নীচতাপূর্ণ মনোভাব।
৩) স্মৃতিশক্তির বিপর্যয়, বুদ্ধিবৃত্তির বিশৃঙ্খলা ও আত্নহত্যা করার প্রবণতা।
৪) আচিঁল, টিউমার হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
৫) সাইকোসিস রোগী রক্তশূণ্যতায় ভুগিবার ফলে মুখ মন্ডল মলিন ও ফ্যাকাশে বর্ণের হয়ে থাকে।
৬) রোগীর ঠোঁট মলিন ও কানের লতি স্বচ্ছ।
৭) নাসিকা রক্তিম বর্ণের, তাহাতে কৈশিক নালী গুলো সুস্পষ্ট দেখা যায়।
৮) নাসিকা পর্দা পুরু এবং ঘ্রাণশক্তি লোপ পায়।
৯) অন্ডকোষ প্রদাহ, মূত্রযন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার, জরায়ুর অর্বুদ, বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদি দৃষ্ট হয়।
১০) রোগী বর্ষাকালে বা আর্দ্র আবহাওয়ায় অতি সহজেই রোগাক্রান্ত হয়।
১১) জ¦রভাবসহ শিরঃপীড়া, শুইয়া থাকিলে এবং মধ্যরাত্রিতে রোগ বৃদ্ধি পায়।
১২) মাথার তালুতে ঘামসহ শুষ্ক জাতীয় একপ্রকার চর্মরোগ দৃষ্ট হয়।
১৩) সাইকোসিস রোগীর মুখমন্ডল দেখিতে শোথগ্রস্ত, মৃত ব্যক্তির ন্যায় পাংশু এবং নীলাভ। মুখের মধ্যে মাছের আশেঁর গন্ধযুক্ত বা বিস্বাদ।
১৪) প্রচুর পরিমাণে শ্লেষ্মা নিঃসরণকারী হাঁপানি রোগে শেষ রাত্রিতে রোগী স্থিরভাবে শুইয়া বা বসিয়া থাকিতে পারে না।
১৫) মল ত্যাগে হাঁপানীর কষ্ট সামান্য উপশম হয়।
১৬) রোগী বক্ষস্থলে সূঁচ ফোটানো ব্যথা এবং নানাপ্রকার কনকনানিযুক্ত টাটানিপূর্ণ ব্যথা অনুভব করে এবং তাহা চাপনের বৃদ্ধি পায়।
১৭) রোগীর পর্যায়ক্রমে উদরাময় ও আমাশয় দেখা দেয় এবং তাহার সহিত গ্রহ্যপথে একটি শূলব্যথায় রোগী এত কষ্ট পায় যে, ব্যথার চোটে রোগী কাঁদতে থাকে।
১৮) মলদ্বারের অর্শ, ভগন্দর যে কোন রোগের তীব্রতা ও ভীষণতার জন্য রোগী ব্যকুলতা হয়ে পড়ে।
১৯) প্রস্রাব ত্যাগকালে তীব্র যন্ত্রণা, শিশু রোগী যন্ত্রণায় চিৎকার করে।
২০) মূত্রথলীতে পাথুরী, মূত্রকোষের নানা প্রকার কষ্টসহ রোগলক্ষণ বৃদ্ধি পায়।
২১) দেহের বিভিন্ন স্থানে ডুমুর বা ফুলকপির ন্যায় আঁচিল বিশেষতঃ জননেনিদ্রয় অঞ্চলে দেখা যায়।
২২) বসন্ত রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বা বসন্ত রোগের গুটি বাহির হয়।
২৩) হার্পিস, বিসর্প জাতীয় চর্মরোগ হয়। দাড়ির দাদ, মস্তকের ত্বকের দাদ, বিশেষতঃ দাদের ফলে মাথায় চুল পড়িয়া যায়।
২৪) টিকা লইবার ফলে কোন প্রকার উদ্ভেদ সৃষ্টি হয়।
২৫) নাপিতের ক্ষুরের বিষজনিত উদ্ভেদ ও যে কোন মাংস বৃদ্ধি সাইকোসিসের চর্মরোগের পরিচায়ক লক্ষণ।
২৬) চর্ম চকচকে ও মসৃণ। মুখের চর্ম তৈলাক্ত, কড়া, গাত্রচর্মের বর্ণের নানা বিকৃতি দৃষ্ট হয়।
২৭) বিনা কারণে লিঙ্গোচ্ছাস ঘটে।
২৮) হস্তমৈথুনের অদ্যম অভিলাষ।
২৯) স্ত্রীলোকের ঋতুকালীন আক্ষেপিক ধরনের ও শূল বেদনার ন্যায় বেদনা। ঋতুকালীন বাত বেদনা বিশেষ উল্লেখ্যযোগ্য।
৩০) ঋতুস্রাবের সময় ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হয় এবং স্তনে ব্যথা হয়।
৩১) ঋতুস্রাব কাপড়ে লাগিলে ধুইলে দাগ সহজে উঠে না, কিছু থাকিয়া যায়।
৩২) হজমশক্তির সমস্যা, পর্যায়ক্রমে অর্জীণ, উদরাময় ও আমাশয় দেখা দেয়।
৩৩) গাল, গলা ও ঘাড়ের গ্ল্যান্ড স্ফীত ও শক্ত থাকে।
৩৪) রোগীর প্রধান অঙ্গসমূহ রোগে আক্রান্ত হয়। যেমনঃ লিভার, কিডনী ও হৃদপিন্ড ইত্যাদি।

 

সাইকোসিস মায়াজম হতে উৎপন্ন রোগ সমূহঃ

সাধারণতঃ নিম্নলিখিত রোগগুলি সাইকোসিস মায়াজম হতে উৎপন্ন হয়ে থাকে। যথাঃ সাইকোসিস দোষ হতে রোগীর দেহে সকল ছিদ্র পথে যন্ত্রণাদায়ক স্রাব, স্রাব সংক্রান্ত বিশৃঙ্খলা ও ব্যথা, যন্ত্রণাদায়ক স্বরভঙ্গ, কাশি, হৃদপিন্ডের দুর্বলতা জনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদপিন্ডের যন্ত্রণা ও স্নায়ুবিক দুর্বলতা,  শুষ্কজাতীয় হাঁপানী, হুর্পি কাশি, মেরুমজ্জায় যন্ত্রণাযুক্ত স্থায়ী প্রদাহ, মস্তিক আবরক ঝিল্লী প্রদাহ, বাত, বসন্ত, স্নায়ুশূল, উদরশূল, হার্পিস, ছোট ছোট পুঁজহীন ব্রণ, অকারণে লিঙ্গোচ্ছেদ, যন্ত্রণাদায়ক ঋতুস্রাব, গর্ভস্রাব, গর্ভাবস্থায় বা প্রসবকালীন মূর্ছা ও খিঁচুনী, ভ্যাদাল ব্যথা ইত্যাদি রোগ লক্ষণ আবির্ভাব হয়। 

 

টিউবারকুলার মায়াজম

দুই বা ততোধিক মায়াজম দ্বারা সৃষ্ট অর্থাৎ সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিস এর সংমিশ্রণে যে রোগ প্রবণতা সৃষ্টি করে, তাহাকে টিউবারকুলার মায়াজম বলে। সোরার সহিত সাইকোসিস বা সিফিলিসের সংমিশ্রণে টিউবারকুলার মায়াজমের উৎপত্তি। পিতা মাতার দেহে সোরা ও সিফিলিসের মিলন ঘটে তাহা বংশগতভাবে বংশ পরস্পর ঐ দোষ চলতে থাকে, এই মিশ্রিত অবস্থাটি টিউবারকুলার মায়াজমের পরিগণিত হয়।
টিউবারকুলার অবস্থাটি সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। যদি টিউবারকুলার দোষ জনিত কোন বহিঃপ্রকাশকে অসদৃশ বিধান মতে চিকিৎসার নামে চাপা দেওয়া হয়, তাহা অচিরেই টিউবারকুলোসিস রোগ প্রবণতা সৃষ্টি করে।

টিউবারকুলার মায়াজমের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সাধারণ প্রকৃতিঃ সোরা সিফিলিসের সংমিশ্রণে এই মায়াজমের সৃষ্টি হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে, লক্ষণ সমূহের পরিবর্তন সৃষ্টি করে গোলমাল বাধায়। একদৈশিক ব্যাধি। অমূলক লক্ষণ সমূহ, অস্পষ্ট লক্ষণ সমূহ পরিবর্তনশীল পরস্পর বিরোধ অবস্থা। স্ক্রোফুলা ধাতু বিশিষ্ট।

আক্রমণধারাঃ অ্যাডেনয়েড গ্রন্থি, যা ঘাড়ে দেখা যায়। অস্থি, মাংসপেশি, রক্ত সবই অপূর্ণ ও অস্পষ্ট।

রোগের প্রকৃতি বা উৎসঃ নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া, দেহ থেকে নিস্কাশন, ক্রমশ ক্ষীণ দুর্বল হয়ে যাওয়া, জীবনী রসের ক্ষয়, উদরাময়, মূত্র ঘাম, রক্তস্রাব, বহুমূত্র, প্লুরিসি, সবিরাম ও আন্ত্রিক জ¦র ইত্যাদি। দ্রুত শারীরিক ক্ষয় এবং সহজেই ক্লান্তি ও দুর্বলতা আসে।

খাদ্যে ইচ্ছা- অনিচ্ছাঃ লবণ খাবার ইচ্ছা (চরিত্রগত), মাংসে অনিচ্ছা।

হ্রাসবৃদ্ধিঃ হ্রাস ও বৃদ্ধি সোরিক সিফিলিসের প্রভাবের উপর নির্ভরশীল। রাত্রিকালে বৃদ্ধি।

মানসিক লক্ষণঃ মানসিক অবস্থা পরিবর্তনশীল এবং প্রায় পরস্পর বিরোধী। নিজের রোগের গুরুত্ব সর্ম্পকে উদাসীন ও ভ্রুক্ষেপবিহীন (চরিত্রগত)। আরোগ্য সম্পর্কে সর্বদাই আশান্বিত। অভ্যাস দ্রুত পরিবর্তন করে। বাসস্থান, পেশা এবং চিকিৎসক পরিবর্তন চায়। সর্বদা অন্য কিছু কাজ করতে চায়। অর্থাৎ এক কাজে বেশি ক্ষণ মন দিতে পারে না।

মস্তকঃ মাথাধরা মস্তকের গোড়া থেকে শুরু হয়। মাথা ধরায় শিশুরা হাত দিয়ে বা অন্য কোন কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করতে চায়। মাথায় পানি জমে ফলে যন্ত্রণা হয়। মাথা পুরু, মোটা ও ভারী হয়।

চক্ষু ও কর্ণঃ চোখের পাতা ফোলা। কৃত্রিম আলো সহ্য করতে পারে না। চোখের পাতা লালবর্ণ। কানে ফোঁড়া ও পুঁজ হয়। ঠান্ডা লাগার দরুণ কানে পুঁজ, গলায় ক্ষত হয়।

নাসিকাঃ ছোটদের সামান্য কারণে নাক হতে রক্তপাত হয়। যেমনঃ নাক বাড়লে, মুখ ধুলে। নাকে চর্ম এবং শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীর ক্ষয়রোগ দেখা যায়।
স্বাদ ও পাকস্থলীঃ পঁচা মতো, পুঁজের মতো, রক্তের মত, মাড়ি থেকে খুব রক্ত পড়ে। খাবার পরেও প্রচন্ড ক্ষুধা।

মলঃ স্থায়ী উদরাময়হেতু দৈহিক রসরক্তের ক্ষয়। মল আমযুক্ত, রক্তযুক্ত, মাটির মত গন্ধযুক্ত। মলদ্বার থেকে রক্তপাত হয় (চরিত্রগত)। মলদ্বারে ভগন্দর এবং পকেটের মত হয়। লক্ষণ সমূহের পরিবর্তন যথা, অন্ত্রের রোগের সঙ্গে হৃৎপিন্ডের, ফুসফুস বা বক্ষঃস্থলের কষ্টের পাল্টাপাল্টি অবস্থা হয়। হাঁপানি।

প্রস্রাবঃ অবিরত মূত্রত্যাগহেতু স্থায়ীভাবে সঞ্জীবনী রসের ক্ষয় ক্ষতি। মূত্র ফসেফেট, শর্করা, অথবা প্রোট্রিন পূর্ণ থাকে। বহুমূত্রে রোগ দেখা যায়।

হৃৎপিন্ডঃ সোরাধাতুর সঙ্গে সর্ম্পকযুক্ত রোগী। হৃদরোগে স্থিরভাবে থাকতে চায়। উচুতে উঠতে পারে না অথবা পাহাড় পর্বতে থেকে নামতে পারে না। অতি উচ্চস্থানে উঠলে রোগ বৃদ্ধি পায়।

চর্মঃ উদ্ভেদ এবং আঘাতপ্রাপ্ত ক্ষত আরোগ্য হতে বিলম্ব হয়। গালে চক্রাকারে দাগ দেখা যায়। ঋতুস্রাবের সময় ছাড়াও তাপমাত্রা কমে যায়।

নখঃ নখ অসমান, ভঙ্গুর, সহজে টুকরো হয়ে ভেঙ্গে যায়। নখের পাশ থেকে চামড়া ছিন্নবিছিন্ন হয়ে নখ সরে ও ঋুলে যায় (চরিত্রগত), খুবই মসৃণ চকচকে নখ। সাদা ছোট দাগযুক্ত নখ।

 

টিউবারকুলার মায়াজমের প্রধান প্রধান লক্ষণ সমূহঃ

১) রোগী ক্রোধপরায়ণ, অসহিঞ্চু, অসন্তুষ্ট, চঞ্চল ও পরিবর্তনশীল মেজাজের।
২) সর্ব বিষয়ে চিন্তা শূণ্যতা ও উদাসীনতা।
৩) চিকিৎসা সত্তেও বারবার একই রোগলক্ষণ আসা যাওয়া করে এবং বিভিন্ন ভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আবির্ভাব হয়।
৪) বার বার ঠান্ডা ও সর্দি লাগার প্রবণতা দৃষ্ট হয়। ব্রঙ্কাইটিস ও নিমোনিয়া হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
৫) যথেষ্ট খাবার গ্রহণের সত্ত্বেও কোন ছাড়াই শীর্ণতা, শুষ্কতা ও দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
৬) দেহের যাবতীয় গ্ল্যান্ডসমূহের স্ফীতি দৃষ্ট হয়। গালের নিচে বা কুচকি স্থানে বা উদরের গ্ল্যান্ড স্ফীতি হয়।
৭) রোগীর অত্যাধিক কামস্পৃহার প্রবৃত্তি সদা জাগ্রত থাকিবার ফলে রোগী হস্তমৈথুন করিয়া কিংবা কোন অবৈধ্য পন্থায় শুক্রক্ষয় করে।
৮) কুকুর দেখিলে ভয় পায়।
৯) যন্ত্রণাদায়ক শিরঃপীড়া, সাধারণতঃ প্রত্যেকদিন ছুটির দিনে ডান চক্ষু হইতে বাম কর্ণ পর্যন্ত একটি সরল রেখার ন্যায় ধাবিত হয়।
১০) মাথার চুলগুলো রুক্ষ, কর্কশ, জঁটাবাধা এবং অগ্রভাগ ফাটা ফাটা।
১১) দাদ জাতীয় চর্মরোগ দেখা যায়। গোসল করলে, মাথায় পানি দিলে এবং খোলা বাতাসে বৃদ্ধি পায়।
১২) অঞ্জনী জাতীয় যাবতীয় চক্ষুরোগ সৃষ্টি হতে পারে।
১৩) পুরাতন জাতীয় চক্ষুক্ষত, আলোকভীতি, এমনকি কৃত্রিম আলো সহ্য হয় না।
১৪) চক্ষুর যাবতীয় স্রাব, চক্ষুর স্নায়ুবিক যন্ত্রণা, উত্তাপে উপশম হয়।
১৫) পড়াশুনা করিতে করিতে চক্ষুর পাতা বন্ধ হয়ে আসে। চক্ষুতে ব্যথা বোধ হয়। চক্ষু বন্ধ করিলে উপশম হয়।
১৬) চক্ষুর পাতা ফোলা, লালবর্ণ।
১৭) কানে শুষ্কজাতীয় চর্মপীড়ার আবির্ভাব এবং বার বার কর্ণমূল গ্রন্থি, গ্ল্যান্ডের স্ফীতি ও তৎসহ টনসিলের প্রদাহ দেখা দেয়।
১৮) নাকের পলিপাস হতে প্রচুর পরিমাণে রক্তস্রাব হয়।
১৯) স্কুল ও কলেজগামী ছেলেমেয়েদের নাক হতে রক্তস্রাব হয়।
২০) রোগীর মুখমন্ডলে ক্ষুদ্রাকৃতির যন্ত্রণাদায়ক স্ফোটক বা বয়ঃব্রণ হয়।
২১) রোগীর চক্ষুদ্বয় কোটরাগত, মুখ মন্ডল ফুটফুটে অথচ দেহের অন্যান্য অঙ্গ শুষ্ক ও শীর্ণ।
২২) দাঁত মাজিবার সময়ও দাঁতের মাড়ি হতে প্রচুর পরিমাণে তাজা রক্তস্রাব হয়।
২৩) দন্তোদগমের সময় জ¦র, উদরাময়, আমাশয়, মেনিনজাইটিস প্রবৃত্তি দেখা যায়।
২৪) মুখে দুর্গন্ধ, পুঁজ ও রক্তের স্বাদ, কফস্রাব মিষ্টি, সময়ে সময়ে লবণাক্ত বা ডিম পঁচার ন্যায় স্বাদযুক্ত কিংবা একেবারে স্বাদহীন।
২৫) দন্তোদগমের সময়ে পিত্তহীন, ছাইবর্ণ বিশিষ্ট, পরিবর্তনশীল এবং সময়ে সময়ে রক্তবর্ণ মলত্যাগে করিতে দেখা যায়।
২৬) গুহ্যপথ হতে যে কারণে প্রচুর রক্তস্রাব এবং কৃমি লক্ষণ দেখা দেয়।
২৭) পোড়ামাটি, খড়িমাটি, কাঠকয়লা, চা, চুন ইত্যাদি অখাদ্য খাইবার আকাঙ্খা।
২৮) কাশির সহিত রক্তমিশ্রিত শ্লেষ্মা বা শুধু রক্ত নির্গত হইতেও দেখা যায়।
২৯) সর্দি কাশির সহিত রোগীর টনসিল, গলদেশের গ্ল্যান্ডস্ফীতি হয়।
৩০) ঋতুস্রাবের আধিক্যের ফলে মাথা ঘোরা, মাথাধরা, মাথা ব্যথা, কোমরব্যথা, অত্যন্ত দুর্বলতা, সংজ্ঞা লোপ ও হজম শক্তির গোলযোগ কিছুকাল চলিবার পরে, কিছুদিন বিরতি দিয়ে পুনবায় আবির্ভাব হয়।
৩১) ঋতুস্রাব অবসান হলে মুখের চেহারা বিবর্ণ, চক্ষু কোটরাগত হয়, চোখের চারদিকে কালিমা পড়াসহ রোগী একেবারে রক্তশূন্যতা দেখা যায়।
৩২) ঋতুস্রাবের পূর্বে ও পরে তরল, ক্ষতকর প্রদরস্রাব দৃষ্ট হয় এবং যেখানে লাগে সেখানেই চুলকায় ও সুড়সুড় করে।
৩৩) দাঁদ, একজিমা ও হার্পিস জাতীয় চর্মরোগ দেখা হয়। প্রায় সব দাদ সাইকোসিস। দাদ চাপা দেওয়ার ফলে টিউবারকুলার লক্ষণ প্রকাশ পায়।
৩৪) কুষ্ঠ পীড়া, গলিত কুষ্ঠ ও শে^তকুষ্ঠ দেখা যায়।
৩৫) গর্ভাবস্থায় স্ত্রীলোকদের যৌনিপথে যন্ত্রণাদায়ক উদ্ভেদ, চুলকানি পূর্ণ উদ্ভেদ।
৩৬) মশা, মাছি, ছারপোকা দংশিত স্থানটি পাকিয়া যায় কিংবা সামান্য আঘাত জনিত ক্ষতস্থানটি শুকাইতে বিলম্ব হয়।
৩৭) হাতের নখগুলি অসমান, ফাটাফাটা এবং টেউ খেলানো। নখ ও মাংসের সংযোগস্থালে পুঁজ হয় এবং ভঙ্গুর।

মহামতি ডাঃ নীলমণি ঘটক তাহার লেকচারস অন টিউবারকুলিসিস বইতে বিশেষ সম্ভাবণাপূর্ণ যে লক্ষণসমূহের কথা বলেছেন এবং তার প্রতিরোধের উপায় হিসাবে তিনি চৌদ্দটি উপায়ের কথা বলেছেন। যথাঃ

১) প্রথম ও সর্বপ্রধান উপায় হল প্রত্যেকটি পীড়া, তা সামান্য হলেও হোমিওপ্যাথিক পদ্ধিতে চিকিৎসা করা। কখনো তাতে বাহ্য প্রয়োগ না করা এবং কোন অসৃদশ বিধানের চাপা দেওয়া চিকিৎসার আশ্রায় না নেওয়া।
২) রোগীকে সব সময় তার বৃত্তি, খাদ্য, ব্যায়াম বিশেষত ইন্দ্রিয় বিষয়ে মিতাচারী হতে হবে। অসাড়ে শুক্রক্ষয় হলে তা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ক্ষয়রোগীর দেহে শুক্রধারণ ও সঞ্চয়ের উপকারিতা অসীম।
৩) যে কোন সন্দেহজনক ক্ষয় যথা, নাক থেকে রক্তস্রাব ও রাত্রে নিদ্রাকালে অসাড়ে শুক্রক্ষয় ইত্যাদি ধাতুগত ঔষধপ্রয়োগে অতি শীঘ্র বন্ধ করতে হবে।
৪) অত্যন্ত শুষ্কতা অর্থাৎ ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা অস্বাভাবিক বেশি ঘাম হওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখতে হবে, যেহেতু ঐগুলির পর অনেক সময় ক্ষয়রোগ আসতে দেখা যায়।
৫) অন্ত্রের গোলমাল, বিশেষত মধ্যে মধ্যে তরল মল, টিউবারকুলোসিসের পূর্ব নিদর্শন।
৬) নাকের সর্দি কেমন করে ও কেন বারবার হতে থাকে জানা বা ধরা না গেলে তা অবস্থা বিশেষ সন্দেহজনক।
৭) শ্বাসযন্ত্রের যে কোন পীড়ায় এলোপ্যাথিক চিকিৎসা করানোর ইতিহাস আছে কিনা তা বিশেষভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। প্রায়ই দেখা যায় যে, যক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর এ থেকেই স্থাপিত হয়।
৮) পূর্ণ শ্বাসগ্রহণ করতে অসমর্থ হওয়ার জন্য ফুসফুসের সম্পূর্ণ বিস্তার না হলে বিশেষ সাবধান হবে। 
৯) দেহের কোন স্থানে দাঁদ থাকলে বিশেষ সর্তকতার সঙ্গে লক্ষ্য করতে হবে যে, তা যেন চাপা দেওয়া না হয় বা কোন বাহ্য ঔষধ প্রয়োগ করা না হয়।
১০) বয়স্ক ব্যক্তির তরুণ সিফিলিস বা গনোরিয়া পীড়া হলে, তা যতদিন পর্যন্ত না সমলক্ষণে চিকিৎসা ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ ও নিদোষরুপে আরোগ্য হচ্ছে ততদিন যেন তাদের বিবাহ দেবার কথা চিন্তা না করে।
১১) উম্মাদপীড়া থেকে যক্ষা আসতে পারে। সুতরাং উম্মাদপীড়া বা ক্ষয়রোগ প্রাপ্ত ছেলে মেয়েদের বিবাহ দেওয়া সঙ্গত নয়। কেননা, তাদের টিউবারকুলিসিস হবার সম্ভবনা রয়েছে।
১২) টিউবারকুলিসিস রোগ হবার ভয়, এ রোগের পূর্ব নিদর্শন।
১৩) দেহের যে কোন প্রকার ক্ষয়প্রবণতাকে অবশ্যই আরোগ্য করতে হবে। কোন অস্বাভাবিক ঘর্ম, অস্বাভাবিক পরিমাণ প্রস্রাব, নাসিকা বা দেহের অন্য কোন ছিদ্রপথে বা ঋতুকালে প্রচুর পরিমাণে রক্তস্রাবের প্রবণতা, হস্তমৈথুনের প্রবৃত্তি ও তাতে উপশমবোধ ইত্যাদি লক্ষণ থাকলে, বুঝতে হবে যে, ঐ ব্যক্তির শুষ্ক জাতীয় টিউবারকুলিসিস আসন্ন। ঐগুলি সর্তকবাণী হিসাবে বিবেচনা করে ধাতুগত চিকিৎসার দ্বারা অবশ্যই আরোগ্য করতে হবে।
১৪) যে পরিমাণ স্রাব তদপেক্ষা বেশি, এমন কি অত্যন্ত বেশি, দুর্বলতা ও অবসন্নভাব টিউবারকুলার ধাতুর একটি প্রকৃত ও অদ্ভুদ নিদর্শন বলে গণ্য করতে হবে।

টিউবারকুলিসিসের পূর্ণ বিকাশ অবস্থায় আরোগ্যের সম্ভবনা থাকে অতি অল্প। ধাতুদোষের অবস্থা বা প্রাথমিক অবস্থাতেই কেবল আশা করা যায়। অবস্থা যাই হোক না কেন, যতদিন প্রকৃত বিকাশের স্থান নির্বাচিত না হচ্ছে অথবা যতদিন কেবলধাতুদোষই বর্তমান থাকে, ততদিন রোগী আরোগ্য হতে পারে। কিন্তু কলার পরিবর্তন শুরু হলে আরোগ্যেও আশা করা যায় না।

ডাঃ নীলমণি ঘটক তাঁর লেখায় বলেছেন, প্রকৃত বিকাশের স্থান নির্বাচনের পূর্বে, কোন কলার পরিবর্তন আসার আগেই ধাতুগত চিকিৎসার দ্বারা আরোগ্যক্রিয়াটি সমাধা করতে হবে। অর্থাৎ যতক্ষণ ধাতুগত দোষ আকারে থাকবে, ততক্ষণই রোগীকে আরোগ্য করার উপযুক্ত সময়।
একথা, শুধু টিউবারকুলার দোষের ক্ষেত্রেই নয়, সর্বপ্রকার দোষ বা মায়াজমের ক্ষেত্রে যেমন সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই গুলি যতক্ষণ দোষ আকারে থাকে ততক্ষণই ঐ সব ধাতুদোষঘœ ঔষধসমূহ সমলক্ষণে প্রয়োগের দ্বারা দোষমুক্ত করার উপযুক্ত সময়।

টিউবারকুলার মায়াজম হতে উৎপন্ন রোগ সমূহ

সাধারণতঃ নিম্নলিখিত রোগগুলি টিউবারকুলার মায়াজম হতে উৎপন্ন হয়ে থাকে। যথাঃ- শুষ্ক জাতীয় দাঁদ, একজিমা, উন্মদ, কৃমি, উদরী, ম্যালেরিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, যন্ত্রণাবিহীন স্বরভঙ্গ, অন্ধত্ব, দৈহিক শুষ্কতা, মেরুমজ্জার ক্ষয়, অন্ত্রাবরোধ, কার্বংকাল জাতীয় ফোড়া, শৈশবকালীন শয্যামূত্র, প্রস্রাবের সহিত যে কোন পদার্থ বা ধাতু নির্গমন, নিউমোনিয়া, গলা ও স্তনে মধ্যে স্থায়ীভাবে গ্রন্থিস্ফীতি, শয্যাক্ষত, পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্ষত, যে কোন স্থানের ক্যান্সার, প্রসবকালীন মূর্ছা ও প্রসবান্তিক উন্মাদ রোগ প্রভৃতি।

শরীরের বিভিন্ন স্থানে মায়াজমের লক্ষণ

মাথাঃ সোরার মাথাধরা দিনেই বেশি। সারাদিন ভালো, সন্ধ্যায় থেকে রাত্রিকালে বৃদ্ধি সিফিলিসে। মাথাধরার সাথে মৃত মানুষের মত হাত-পা ঠান্ডা, দুর্বলতা, বিষণ্নতা, হতাশভাব টিউবারকুলার মায়াজমে। পিত্তপ্রধান্য, বমিভাব, মাসে একবার বা দুবার আক্রমণ, স্থিরভাবে বিশ্রাম ও নিদ্রায় উপশম সোরিক মায়াজমে। বিশ্রাম, গরম, নিদ্রায় চেষ্ঠায় বৃদ্ধি সিফিলিটিক। মুখ লাল, মাথায় রক্তাধিক্য, প্রায়ই পূর্বাহ্নে মাথাধরা এবং বিশ্রাম, স্থিরভাবে, নিদ্রা ও আহারে উপশম সিউডো সোরিক। নাকে রক্তপাতে উপশম যে কোন রোগে টিউবারকুলার মায়াজমে।

মাথার বর্হিভাগঃ সোরার চুলগুলো শুষ্ক সৌন্দর্যহীন। সহজে জটলা বাধে, মাথার ঢাকা খুলতে অনিচ্ছা, মাথায় শুষ্ক চর্মরোগে, মাথায় শুষ্কে আঁশে পরিপূর্ণ, খুসকি। তরুণ রোগের পর মাথার চুল উঠে যায়, শুস্ক চুল টিউবারকুলার বা পুরানো সিফিলিস। চোখের পাতা ও ভ্রুর চুল উঠতে থাকে সিফিলিসে। চাকা চাকা চুল উঠে টাক হয় সাইকোসিসে। মাথায় সরস চর্মরোগ টিউবারকুলার। চুল থেকে আষঁটে গন্ধ সাইকোসিস। পচা বা টকগন্ধ, তৈলাক্ত মাথা টিউবারকুলার বা সুপ্ত সিফিলিসে।

চোখঃ সোরা চক্ষুগোলাকে গভীরভাবে আক্রমণ করে। সাধারণত সিফিলিস যন্ত্রসমূহে ভীষণভাবে আক্রমণ করে। চোখের আকার পরিবর্তন আনে সিফিলিটিক বা টিউবারকুলারে।

কানঃ কানের পুঁজ জন্মে এবং কর্ণ মধ্যস্থ ধ্বংসকারী টিউবারকুলারে। কানের মধ্যে মাংসপচাগন্ধযুক্ত পুজ ও ফোড়া সিউডোসোরিক। সোরার কানের মধ্যে সর্বদাই শুষ্ক আশঁযুক্ত থাকে। কানের একজিমা বিশেষত রসযুক্ত, ফুসকুড়িযুক্ত ও ফাটাফাটা চটাযুক্ত সাধারণত টিউবারকুলারে।

নাসিকাঃ সোরা ঘ্রাণশক্তির বৃদ্ধি ঘটায়, সাধারণত গন্ধের দ্বারা পীড়িত হয়ে পড়ে। অনেকের ঘ্রাণশক্তি কমে যায়। বেশির ভাগ সিফিলিস ও সাইকোসিস মায়াজমে এরুপ হতে পারে। নাকের হাড় নষ্ট করতে পারে একমাত্র সিফিলিস মায়াজমে। সাইকোসিসে নাকে হলদে স্রাব নির্গত হয়। টিউবারকুলারে ঘন, হলদে এবং পচা মাখনের গন্ধযুক্ত বা পচা ডিমের গন্ধযুক্ত।

মুখমন্ডলঃ গালে গোলাকার লাল ছোপ নিঃসন্দেহে টিউবারকুলারে, তা যে কোন বয়সে হোক। সিফিলিসে রোগীর মুখমন্ডল ধূসর এবং চর্বি মাখা হয়। সোরায় শুস্ক ও অপরিস্কার। ঠোটের গভীরে ফাটা সিফিলিটিক বা টিউবারকুলার।

খাদ্যে ইচ্ছা- অনিচ্ছাঃ সোরায় মিষ্টি, টক এবং টকজাতীয় খাদ্য খেতে চায়। টিউবারকুলারও এইসব খেতে চায়। তবে সোরা মায়াজমে অত্যন্ত গভীরভাবে ইচ্ছা প্রকাশ করে। টিউবারকুলারে হজম করতে পারে না এমন খাদ্য খেতে চায়। যেমনঃ খড়িমাটি, চুন, পেন্সিল ইত্যাদি। সোরা ভাজা জিনিস পছন্দ করে। সিদ্ধ জিনিস অপছন্দ। সোরা চা, কফি, তামাক, মাংস এবং গরম খাদ্য চায়। সাইকোটিক ও সোরিক রোগীর গরম খেলে উপশম। অন্যদিকে সিফিলিটিক ও টিউবারকুলারে প্রায়ই ঠান্ডা খাদ্য ও পানীয় চায়। টিউবারকুলারে লবণ প্রিয় হয়ে থাকে।

মায়াজমের সংক্ষিপ্ত রুপ বা চরিত্র

সোরা, সিফিলিস, সাইকোসিস ও টিউবারকুলার মায়াজমের সংক্ষিপ্ত রুপ তুলে দিচ্ছি মনে রাখার সুবিধার্থেঃ

সোরাঃ বুদ্ধিমান, চালাক, প্রচন্ড স্বার্থপর, ভন্ড দার্শনিক, ভাবপ্রবণতা, কুঁড়ে ও খুবই নোংড়া, অগোছালো স্বভাব, উত্তেজনাপূর্ণ খেয়ালী, অস্থির, পরিবর্তনশীল ও চর্মরোগপ্রবণ হয়। সোরা এককভাবে যান্ত্রিক কোন পরিবর্তন আনতে পারে না।

সিফিলিসঃ বোকা, বুদ্ধির খর্বতা, নিরাশ, রাত্রে বৃদ্ধি, আত্নহত্যার প্রবৃত্তি, ঘামে বৃদ্ধি, সমস্ত পীড়ায় পচন ও ক্ষতযুক্ত ও সমস্ত স্রাবেই দুগর্ন্ধ।

সাইকোসিসঃ সন্দেহ,হিংসা, বিদ্বেষ, নির্মমতা, গোপন করার ইচ্ছা, ধৈর্য, ও স্মৃতিশক্তিহীনতা, বদ্ধমূল ধারণা ইত্যাদি নানা প্রকার যান্ত্রিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তবে সাইকোসিস কখনও ক্ষত বা পচন আনে না, নানা স্থানে নানা প্রকার শুষ্কতা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও শুষ্কতা।

টিউবারকুলারঃ উপরোক্ত সমস্ত মায়াজমকে সঙ্গে নিয়ে ধ্বংস করবার জন্যই প্রস্তুত রয়েছে।

*******